শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : চলতি সপ্তাহে ইউরোর বিপরীতে ডলারের দর সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, দুর্বল ডলার ‘খুব ভালো কাজ করছে’।
তবে পরদিনই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট শক্তিশালী ডলারের পক্ষে মত দেন। তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য একটি ইঙ্গিত। তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং মার্কিন উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করতে ডলারের মান কম থাকাকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
নিউইয়র্ক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
ডলারের মান কমার প্রভাব বহুমুখী। এতে মার্কিন রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়ে। তবে এর নেতিবাচক দিকও আছে। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
ডলার বর্তমানে কতটা দুর্বল?
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ‘ডলার ইনডেক্স’ অনুযায়ী মার্কিন মুদ্রার মান প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। এই ইনডেক্সে ইউরো ও ইয়েনসহ আরও চারটি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান পরিমাপ করা হয়।
অবশ্য ২০২৪ সালের নভেম্বরে নির্বাচনের দিন থেকে শপথ গ্রহণ পর্যন্ত ডলারের মান প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছিল। এরপর থেকেই মূলত এর পতন শুরু হয়। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডলার এখনও খুব বেশি দুর্বল নয়।
গত মঙ্গলবার রাতে ইউরোর মান ১.২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ। তবে ২০০৮ সালের জুলাইয়ের ১.৬০ ডলারের রেকর্ডের তুলনায় এটি এখনও অনেক নিচে।
ট্রাম্পের আমলে ডলারের মান কমছে কেন?
গত মঙ্গলবার ডলারের মান অতিরিক্ত কমে গেছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমি মনে করি এটি চমৎকার। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখুন।’
আইএনজি-র বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ ফ্রান্সেস্কো পেসোল বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রভাব থাকলেও ডলারের বড় দরপতন আগেই ঘটেছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে ইউরোপের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকির পর থেকেই মূলত বিনিয়োগকারীরা মার্কিন মুদ্রা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন।
৭৯ বছর বয়সী এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিমালার এ অনিশ্চয়তা ছাড়াও ফেডারেল রিজার্ভের নতুন প্রধান নিয়োগের বিষয়টিও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান প্রধান জেরোম পাওয়েল সুদের হার পর্যাপ্ত না কমানোয় ট্রাম্প বারবার তার সমালোচনা করেছেন।
পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে যদি এমন কেউ আসেন যিনি সুদের হার আরও কমানোর পক্ষে, তবে ডলারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
মার্কিন অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী?
ডলার সস্তা হলে বিশ্ববাজারে মার্কিন পণ্য সস্তা হয়, যা রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করে। এটি মার্কিন উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক-যা ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার। এছাড়া বিদেশে ব্যবসা করা মার্কিন কোম্পানিগুলোর মুনাফা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি পর্যটন বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখে।
নেশনওয়াইডের অর্থনীতিবিদ ওরেন ক্লাচকিন বলেন, সাধারণত সব প্রেসিডেন্টই শক্তিশালী ডলারের কথা বলেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে বা প্রকাশ্যে তারা মুদ্রার মান কিছুটা কমই চান, যাতে তাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে এক গবেষণাপত্রে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান স্টিফেন মিরান যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বিশ্ববাণিজ্যের ভারসাম্য ফেরাতে ডলারের অতিমূল্যায়ন কমানো জরুরি।
তবে সস্তা ডলারের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন ফরেক্সলাইভ-এর বিশ্লেষক অ্যাডাম বাটন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ‘আগুন নিয়ে খেলছে’।
তিনি বলেন, ‘ডলারের মান পড়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি হলো, এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।’ বাটন মনে করেন, ডলারের এই পতন দেখে বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য মার্কিন সম্পদ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা মার্কিন বন্ড বাজারে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছেন বলেই যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার এখনও কম।’
‘বলা যায়, পুরো বিশ্বই আমেরিকার এই বিশাল বাজেট ঘাটতির ভর্তুকি দিচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ। তবে এটি চিরকাল থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।’