বাসস
  ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০১

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবিলার ঘোষণা ইরানের, তবে পরমাণু চুক্তিতে আগ্রহী তেহরান

ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির মুখে কঠোর অবস্থানের কথা জানাল ইরান। বুধবার তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক অভিযানের তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দিতে তাদের বাহিনী প্রস্তুত। তবে একইসঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর পথও খোলা রেখেছে দেশটি।

প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সতর্কবার্তায় বলেন, তাদের বাহিনীর ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’ রয়েছে। যেকোনো মার্কিন হামলার ‘শক্তিশালী জবাব’ দেওয়া হবে। 

তবে ট্রাম্পের সুরেই তিনি একটি সম্মানজনক চুক্তির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ইরান সব সময় একটি পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায্য পরমাণু চুক্তিকে স্বাগত জানায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি লিখেন, ‘হুমকি নয় বরং চাপমুক্ত হয়ে সমতার ভিত্তিতে ইরান একটি কার্যকর পরমাণু চুক্তিতে আগ্রহী। এমন চুক্তি যা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির অধিকার নিশ্চিত করবে এবং কোনোভাবেই ‘পারমাণবিক অস্ত্র নয়’ এমন গ্যারান্টি দেবে।’

তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নিরাপত্তা কৌশলে পারমাণবিক অস্ত্রের কোনো স্থান নেই এবং তেহরান কখনোই তা অর্জনের চেষ্টা করেনি। তবে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানের এমন দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে।

এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উপদেষ্টা আলী শামকানি আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সীমিত হামলার চিন্তা একটি অলীক কল্পনা। আমেরিকার যেকোনো পর্যায়ের সামরিক পদক্ষেপকে যুদ্ধের শুরু হিসেবে দেখা হবে। এর জবাব হবে নজিরবিহীন। তখন ইসরাইলের তেল আবিবসহ আগ্রাসনকারীদের সব সহযোগীকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান অভিমুখে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ‘বিশাল রণতরী’ (ম্যাসিভ আর্মাডা) পাঠানোর কথা জানান। 

তিনি বলেন, প্রয়োজনে দ্রুত ও কঠোরভাবে মিশন সম্পন্ন করতে এই বাহিনী প্রস্তুত।

ট্রাম্পের এই হুমকির পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। 

জার্মানিও একই সুরে কথা বলছে। গত ডিসেম্বরে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিশ মের্ৎস দাবি করেন, বর্তমান ইরান সরকারের ‘দিন ফুরিয়ে এসেছে’।

একই সঙ্গে ফ্রান্স ও জার্মানি মিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) চাপ দিচ্ছে যেন ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’কে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা আগেই এই বাহিনীকে নিষিদ্ধ করেছে।

ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া ইরানবিরোধী বিক্ষোভ জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখে চরম আকার ধারণ করে। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ২০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে বিক্ষোভের চেয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত বছর জুনে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও মার্কিন বাহিনী ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।

এদিকে, অস্থিরতা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এছাড়া কাতার ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ) জানায়, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ২২১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৮৫৬ জন বিক্ষোভকারী ও ১০০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক, ২১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য এবং ৪৯ জন সাধারণ মানুষ। 

সংস্থাটি আরও জানায়, তারা আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের সম্ভাব্য মৃত্যুর খবর তদন্ত করছে। এ ছাড়া অন্তত ৪২ হাজার ৩২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

এইচআরএএনএ সতর্ক করে বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতালগুলোতে আহত বিক্ষোভকারীদের খুঁজছে, যা চলমান দমন-পীড়নের এক ‘নতুন মাত্রা’ প্রকাশ করে।

এদিকে, প্রায় তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা ৯৫ শতাংশ চালু হলেও এখনো কঠোর সেন্সরশিপ বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট মনিটর ‘নেটব্লকস’।