শিরোনাম

ঢাকা, ৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : প্রাণীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আইসিডিডিআর'বি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। 'গাইডেন্স ফর ইফেক্টিভ ভ্যাকসিনেশন ম্যানেজমেন্ট ফর লাইভস্টক, পোলট্রি অ্যান্ড পেটস ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক নির্দেশিকার চূড়ান্ত পর্যালোচনা ধাপ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক(প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান বলেন, দেশে প্রাণীর জন্য জাতীয় টিকা উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে একটি কার্যকর ও সমন্বিত টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই খাত দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৮১ শতাংশ অবদান রাখে এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত, যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে বাস্তবতা হলো-গ্রামীণ পর্যায়ে মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ কৃষক নিয়মিতভাবে তাদের প্রাণীদের টিকা দিয়ে থাকেন।
মানুষের জন্য সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর জন্য এখনো একটি সমন্বিত জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সচেতনতার অভাব, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভীতি, দুর্বল কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, টিকার অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের ঘাটতি-এসব কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ওয়ান হেলথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাম ও বার্ড ফ্লুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের দেখিয়েছে যে, টিকাদানে ঘাটতি থাকলে মানুষ ও প্রাণী উভয়ই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, প্রাণীর টিকাদান শুধু প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় নয়—এটি পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ উদীয়মান সংক্রামক রোগের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জুনোটিক বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সহাবস্থান, জীবন্ত পশুপাখির বাজার এবং দ্রুত নগরায়ণ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। অ্যানথ্রাক্স, রেবিস ও বার্ড ফ্লুর পুনরাবৃত্ত প্রাদুর্ভাব এ দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বর্তমানে প্রাণীর টিকাদান, শনাক্তকরণ ও রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের অভাব কার্যকর নজরদারির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত টিকা কার্ড ব্যবস্থায় গবাদিপশু, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর জন্য পৃথক কার্ড চালুর কথা বলা হয়েছে। এতে প্রাণীর পরিচিতি, টিকাদানের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সময়সূচি সংরক্ষণ করা হবে। এর ফলে টিকাদান কার্যক্রমের নজরদারি, সমন্বয় এবং পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে।
আইসিডিডিআর'বি ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ও টিম লিডার ডা. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এই টিকা কার্ড চালুর মাধ্যমে কৃষকরা সহজেই তাদের প্রাণীর টিকাদান ট্র্যাক করতে পারবেন, ফলে কভারেজ বাড়বে এবং রোগ প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে। এতে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে এবং প্রাণিসম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তাবিত কাঠামোতে অগ্রাধিকারভিত্তিক রোগের জন্য মানসম্মত টিকাদান সময়সূচি, উন্নত প্রতিবেদন ও সমন্বয় ব্যবস্থা এবং ওয়ান হেলথ পদ্ধতির আওতায় প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেন।
তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে, নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং জুনোটিক রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।