শিরোনাম

ঢাকা, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ই-গভর্নেন্সকে আরও নাগরিককেন্দ্রিক, সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করতে এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটালাইজেশন, শক্তিশালী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো, উন্নত ডিজিটাল সক্ষমতা এবং কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার সুপারিশ করেছেন আলোচকরা।
আজ ‘ই-গভর্নেন্স অ্যাট দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস : কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক সংলাপে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। নাগরিকতা : সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)-এর উদ্যোগে এবং সুইজারল্যান্ড ও কানাডার অংশীদারত্বে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সংলাপে সভাপতিত্ব করেন। নাগরিকতা : সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)-এর উপদলনেতা ক্যাথারিনা ক্যোনিশ উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন।
আলোচনায় অংশ নেন আইসোশ্যালের চেয়ারম্যান ড. অনন্যা রায়হান, পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টের এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মোহায়মেন, অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)-এর জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফজলুল জায়েদ পাভেল এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নুর উল্লাহ।
সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ এবং গবেষণা সহযোগী সাবিনা শারমিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আলোচকরা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল রূপান্তর শুধু অনলাইনে ফরম ও তথ্য প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং নাগরিকরা যেন সরকারি কার্যালয়ে বারবার যাতায়াত বা কাগজপত্র জমা দেওয়া ছাড়াই সর্বোচ্চসংখ্যক সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারেন, সে অনুযায়ী সরকারি সেবা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।
সিপিডি’র গবেষণায় ডিজিটাল সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ই-সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন আবেদন, তথ্যের গোপনীয়তা এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় ‘ওয়ান ডিজিটাল মেম্বার পার হাউসহোল্ড’ উদ্যোগ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য প্রয়োজনীয় সরকারি ই-সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
এতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, লক্ষ্যভিত্তিক কমিউনিটি প্রচারণা এবং নারীকেন্দ্রিক ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা ও অননুমোদিত প্রবেশের ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষাকারী ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
আলোচকরা নাগরিকদের সেবা ব্যর্থতা, বিলম্ব, কারিগরি সমস্যা, অনানুষ্ঠানিক ফি আদায় এবং তথ্যসংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণের জন্য সহজলভ্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেন।
তারা বলেন, নারী, যুব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছে কি না, তা মূল্যায়নে নিয়মিত সামাজিক নিরীক্ষা প্রয়োজন।
গবেষণায় প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্ক্রিন রিডার উপযোগী ব্যবস্থা, সহজ ভাষা, অডিও সহায়তা এবং সহজলভ্য ফরম্যাটের মাধ্যমে ই-সেবার তথ্য নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে ‘নো রং ডোর’ নীতি চালুর প্রস্তাব করা হয়, যাতে নাগরিকদের কোনো নির্দিষ্ট সেবা কোন সরকারি সংস্থা প্রদান করে তা জানার প্রয়োজন না হয়। বরং ডিজিটাল ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দেশনা দেবে।
সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে সিপিডি অনুন্নত এলাকায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও গ্রামীণ ডিজিটাল কেন্দ্র সম্প্রসারণ, কম কার্যকর সরকারি সেবাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্বিন্যাস ও সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ ই-সেবা প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরি করে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক উপস্থিতি ও কাগজপত্রের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করেছে।
গবেষণায় ‘এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাল সার্ভিস’ মানদণ্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যার আওতায় আবেদন, যাচাই, অর্থ পরিশোধ, প্রক্রিয়াকরণ, যোগাযোগ ও চূড়ান্ত সেবা প্রদান সম্ভব হলে সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অন্তত একটি কার্যকর কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় আইসিটি সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, প্রতিটি স্থানীয় সরকার কার্যালয়ে একজন আইসিটি ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কারিগরি দলের সমন্বয়ে স্তরভিত্তিক আইসিটি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
সিপিডি সরকারি ডাটাবেজগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ বৃদ্ধি, একক আবেদন-অবস্থা অনুসরণ ব্যবস্থা, সরকারি ফি ও সেবা প্রদানের সময়সীমা নির্ধারণ এবং সেবা প্রাপ্যতা, নাগরিক সন্তুষ্টি, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অন্তর্ভুক্তি পর্যবেক্ষণে ই-গভর্নেন্স পারফরম্যান্স ড্যাশবোর্ড চালুর সুপারিশ করেছে।
এছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা কার্যালয়ের সংযোগ ব্যবস্থা, সরঞ্জাম, জনবলের সক্ষমতা, সেবা প্রাপ্যতা, সাইবার নিরাপত্তা, সহজলভ্যতা ও নাগরিক ব্যবহারের সক্ষমতা মূল্যায়নে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ডিজিটাল রেডিনেস ইনডেক্স’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
আলোচনায় সরকারি কর্মীদের প্রশিক্ষণে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
সংলাপের সমাপনীতে বলা হয়, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল যেন তৃণমূল পর্যায়ের নাগরিকদের কাছে পৌঁছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সেবা প্রদান ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ই-গভর্নেন্স কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।