শিরোনাম

ঢাকা, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিলের প্রায় ১৩৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম খরচে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে বড় ধরনের অবদান রাখার অবস্থানে পৌঁছেছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক বাসস’কে বলেন, প্রকল্পটির জন্য মোট ১ হাজার ৩০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ফলে অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় ১৩৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সফল বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন, সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত, সীমানাপ্রাচীর, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন, কারখানা ভবন, প্রধান ও নিরাপত্তা ফটক নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোমেকানিক্যাল কাজসহ প্রকল্পের আওতাধীন সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা ৫৩৯টি শিল্প প্লটের মধ্যে ৪০১টি ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ আনামুল হক বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল ভালো সাড়া পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইজারা চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৬২ কোটি মার্কিন ডলার।
এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি উৎপাদনে গেলে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে উৎপাদনে থাকা ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টি চীনা, দু’টি দক্ষিণ কোরীয়, একটি কানাডীয় এবং একটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশি মালিকানাধীন। এসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি পোশাক, অন্তর্বাস, জুতা ও জুতার আনুষঙ্গিক পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, পোশাকের উপকরণ, আসবাব, কাঠজাত পণ্য এবং প্যাকেজিং সামগ্রী উৎপাদন করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছরের মধ্যেই আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ইজারা চুক্তি করেছে, তাদের বেশির ভাগই কারখানা ভবন নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
প্রচলিত তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে জুতা ও জুতার আনুষঙ্গিক পণ্য, উন্নত ওষুধ, তামাক শিল্পের যন্ত্রপাতি, ব্যাটারির প্লেট, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, কাটলারি, গ্রিনহাউস ও হাইড্রোপনিক টেন্ট এবং ড্রোনের মতো উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারে।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় মিরসরাইয়ে ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনাগত ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দুটি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ এর আয়তন ৬৪০ দশমিক ২৫ একর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল-২ এর আয়তন ৪৯৮ দশমিক ২৯ একর।
বিনিয়োগকারীদের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানি-রপ্তানি সুবিধা, কর অবকাশ, জিএসপি সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা এবং বেপজার ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থানও বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের জন্য পানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্যাস সংযোগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ ও ইটিপি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
বেপজা পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, মোট এলাকার ১৯ দশমিক ৬০ শতাংশ সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
মোহাম্মদ আনামুল হক বলেন, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু একটি বিনিয়োগকেন্দ্র নয়; কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে একসঙ্গে যুক্ত করে এটি দেশের শিল্পায়নে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
তিনি বলেন, সব প্রতিষ্ঠান পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন বেপজার দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ।