বাসস
  ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৯

আমদানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : আমদানি লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনাগুলো একত্র করে নতুন সমন্বিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের আগস্টে জারি করা আগের সমন্বিত নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ (এফইপিডি-১) এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আগের সমন্বিত প্রজ্ঞাপনের পর বিভিন্ন সময়ে জারি করা নির্দেশনাগুলো নতুন প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নির্দেশিকার (জিএফইটি) দ্বিতীয় খণ্ডে থাকা প্রতিবেদন-সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো বহাল থাকবে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে সব ধরনের অনুমোদিত আমদানি লেনদেনের তথ্য প্রতিদিন বা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন আমদানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (ওআইএমএস)-এ জমা দিতে হবে।

সরকারি আমদানি ছাড়া ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে ওআইএমএসে তথ্য দিতে হবে।

প্রজ্ঞাপনে ব্যাংকগুলোকে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থান, আমদানি মূল্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং লেনদেনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া, আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে পণ্যের গুণগত মান, ব্র্যান্ড, উৎপাদনের তারিখ, মোড়ক, গ্রেড, একক মূল্য ও পরিমাণের পাশাপাশি প্রযোজ্য আট অঙ্কের এইচএস কোড অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নতুন নির্দেশনায় এলপিজিসহ শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণের আওতায় সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের ঋণসুবিধা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সুবিধা কৃষি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক সার আমদানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এ ছাড়া যন্ত্রাংশ, জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য জাহাজ, ইস্পাত শিল্পের নির্দিষ্ট কাঁচামাল, ওষুধ শিল্পের সক্রিয় উপাদান এবং পরীক্ষাগারের রাসায়নিক উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের ঋণসুবিধা রাখা হয়েছে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চক্ষু চিকিৎসায় ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে।

শিল্প খাতের আমদানিকারকদের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মূলধনি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণের আওতায় সর্বোচ্চ তিন বছরের ঋণসুবিধার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে পরিচালিত যোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ সুবিধা পাবে।

বিলম্বিত পরিশোধের ভিত্তিতে আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুদের সর্বোচ্চ হারও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এসওএফআর বা ইউরিবরের মতো আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক হারের ওপর সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ অতিরিক্ত সুদ আরোপ করা যাবে।

আমদানি-ভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আওতায় ক্রেতার ঋণ, সরবরাহকারী অর্থায়ন ও পাওনা অর্থায়নের মতো ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ঋণযোগ্য আমদানিকারকদের জন্য ব্যাংকগুলো ঋণসুবিধা দিতে পারবে। একই সঙ্গে সরবরাহকারীদের অনুকূলে গৃহীত বিলও প্রযোজ্য বিধি অনুসারে ডিসকাউন্ট করা যাবে।

বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক করতে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আইনগত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে চালান ও পরিবহন নথিসহ ইলেকট্রনিক বাণিজ্য নথি ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত বাণিজ্য করিডোরের মাধ্যমে ঋণপত্র ও দলিলভিত্তিক আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের জন্য ডিজিটাল নথি প্রক্রিয়াকরণের একটি পরীক্ষামূলক কাঠামোও চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য নিরাপদ, সমন্বিত ও আইনগতভাবে নির্ভরযোগ্য ইলেকট্রনিক বাণিজ্য নথি ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো।

প্রজ্ঞাপনে আমদানি দায় সময়মতো পরিশোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এমনকি তাদের অনুমোদিত ডিলার লাইসেন্সও বাতিল করা হতে পারে।

আমদানিকারকদের অর্থ পরিশোধের চার মাসের মধ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সত্যায়িত বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে হবে। তবে ঋণসুবিধাভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে পৃথক বিধান রাখা হয়েছে।

পণ্য পরিবহন বা শুল্ক ছাড়ে বিলম্বের মতো যৌক্তিক কারণে প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করা যাবে।

নতুন প্রজ্ঞাপনে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র, বিশেষায়িত ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ঋণপত্র, বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা, সুদের হারজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, গয়না ও মুদ্রা নোট আমদানির বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের ২০(৩) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।