বাসস
  ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩২

দুর্বল প্রবৃদ্ধির যুগে উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে এআই 

ঢাকা, ৬ আগস্ট, ২০২৬ (বিএসএস) : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন অগ্রগতির সুযোগ এনে দিতে পারে, যা প্রচলিত পথে অর্জন করতে এক শতাব্দী সময় লাগতে পারত। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সরকারগুলোকে দ্রুত বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষ জনশক্তি ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ : দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে চাকরি স্বয়ংক্রিয় (অটোমেশন) হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিদ্যমান চাকরির মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ-এ ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, যা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সম্ভাব্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির খুব কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ায় নয়, বরং তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলায়।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, ‘এআই উন্নয়নশীল অর্থনীতির সামনে এক নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে, এবং তাদের এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এর সুফল পেতে বিশাল আকারের মডেল বা বড় ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন নেই। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছোট ও স্বল্পব্যয়ের এআই টুল ব্যবহার করে লাখো মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিচারিক সেবা এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে তাদের দ্রুত এগোতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো আগের সাধারণ প্রযুক্তির তুলনায় এআই অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং এটি স্থানীয় প্রেক্ষাপটনির্ভর। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট-২০২৬ দেখিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে এবং সফল হচ্ছে।’

প্রতিবেদনটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। এতে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে এসব দেশের সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই এআই ব্যবহার শুরু করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ইতোমধ্যে ব্যক্তি, ব্যবসা ও সরকারকে বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ, পূর্বাভাসের মানোন্নয়ন এবং বৃহৎ পরিসরে সেবা প্রদানে সহায়তা করছে।

বিশেষ করে যেসব দেশে প্রশিক্ষিত পেশাজীবী, নির্ভরযোগ্য তথ্য ভান্ডার ও সরকারি সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এআই-এর এসব সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ে, কৃষকদের ফসলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও উৎপাদনশীল হতে সহায়তা করতে পারে। একইভাবে সরকারও কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দুর্যোগ মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে এআই ব্যবহার করতে পারে।

বর্তমানে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল গড় প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-এর দশকের শেষ নাগাদ এআই এই প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবনে বাস্তব সুফল বয়ে আনতে পারে।

তবে এই সুযোগ নিশ্চিত নয়। কারণ সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থা বর্তমানে অল্প কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, তথ্য, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে কার্যকরভাবে এআই ব্যবহার করতে পারছে না।

যথাযথ নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে এআই দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে, অভ্যন্তরীণ অসমতা বৃদ্ধি করতে পারে, বাজারে একচেটিয়া প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং নিরাপত্তা, অধিকার ও সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সুস্পষ্ট তিন ধাপের পথনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-প্রথমে বিদ্যমান এআই সরঞ্জাম গ্রহণ, এরপর সেগুলোকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নত বা ফ্রন্টিয়ার এআই উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া। এই ধাপভিত্তিক কৌশল দেশের মৌলিক প্রস্তুতি ছাড়া ব্যয়বহুল ও অকার্যকরভাবে উন্নত এআই অনুকরণের ঝুঁকি কমাবে।

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এর পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, ‘এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সময় খুবই সীমিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানে এআই এক জীবনে একবারই আসা সুযোগ। যেসব উন্নয়নশীল দেশ এখনই বিদ্যুৎ, সংযোগ, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলবে, তারা তাদের জনগণের কল্যাণে এআই গ্রহণ ও অভিযোজনে এগিয়ে থাকবে।’

প্রতিবেদনটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মৌলিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ছাড়া এআইয়ের সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার গ্রামীণ স্কুলগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশে এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি স্কুলে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগও অনুপস্থিত।

এই ঘাটতি দূর করা ইতোমধ্যেই অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ‘মিশন ৩০০’-এর মাধ্যমে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। যা ভবিষ্যতে ডিজিটাল ও এআই অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশগুলোকে কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও স্থানীয় তথ্য ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে, যাতে এআই প্রযুক্তি নিজস্ব জনগণ ও অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।

সরকারের উচিত নতুন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন ধারণা পরীক্ষার সুযোগ এবং সফল উদ্যোগগুলোকে সম্প্রসারণের পরিবেশ তৈরি করা। বর্তমানে অনেক এআই পরীক্ষামূলক প্রকল্প চলছে, তবে কোনগুলো কার্যকর ফল দিচ্ছে তা নির্ধারণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য উন্নত তথ্য-প্রমাণ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আরও সুস্পষ্ট ক্রয় ও মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন।

প্রতিবেদনের সবশেষে বলা হয়েছে, এআই ব্যবহারে জনগণের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিটি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় সরকারগুলোর উচিত অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ড এবং ধাপে ধাপে নীতিমালা প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ ও কার্যকর এআই ব্যবহারের পরিবেশ নিশ্চিত করা।