শিরোনাম

॥ মুহাম্মদ নূরুজ্জামান ॥
খুলনা, ১৫ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় এবার পাট চাষে বড় সাফল্য এসেছে। আবাদ হয়েছে শতভাগেরও বেশি জমিতে। ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন সম্ভাব্য উৎপাদনে ৯০৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলে পাট কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকরাও বড় আয়ের আশায় বুক বেঁধে আছেন। তারা চোখে এখন ‘সোনালী স্বপ্ন’ দেখছেন। চাষাবাদ অনুযায়ী উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে এবার পাট চাষীদের মুখে হাঁসি ফুটবে বলে তারা আশা করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি বছরে খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় (দেশি, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট) পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার ২৮৭ হেক্টর। সেখানে অর্জিত হয়েছে ৩৮ হাজার ৩৬১ হেক্টর। যার হার ১০২ শতাংশ। এরমধ্যে খুলনা জেলায় ১ হাজার ২৫৭ হেক্টর, বাগেরহাট জেলায় ১ হাজার ৯২০ হেক্টর, সাতক্ষীরা জেলায় ১১ হাজার ৬১০ হেক্টর ও নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
এই সূত্র জানায়, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে খুলনা জেলায় ১ হাজার ২৩০ হেক্টর (হার ৯৭.৯%), বাগেরহাট জেলায় ১ হাজার ৯৩৯ হেক্টর (হার ১০১.০%), সাতক্ষীরা জেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর (হার ১০০.৬%) ও নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর (হার ১০০.১%) পাট চাষ হয়। যা লক্ষ্যমাত্রার বেশি।
একইভাবে পাট উৎপাদনের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে খুলনায় ২ হাজার ৮০৭ মেট্রিক টন, বাগেরহাটে ৪ হাজার ৪০১ মেট্রিক টন, সাতক্ষীরায় ২৫ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টন ও নড়াইলে ৫৭ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন।
কৃষি দপ্তরের হিসেবে বলছে, খুলনাঞ্চলের ৪ জেলার সমন্বয়ে সম্ভাব্য উৎপাদন ৯০ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন পাট। পাটের সম্ভাব্য উৎপাদনের বিপরীতে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে (গত বছর স্থানীয় মোকামের দর অনুযায়ী, প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা) খুলনায় ২৮ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ২শ’ টাকা, বাগেরহাটে ৪৪ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৪শ’ টাকা, সাতক্ষীরায় ২৫৬ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার ৬শ’ টাকা এবং নড়াইলে ৫৭৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪৩ হাজার ৬শ’ টাকা। ৪ জেলার সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৯০৫ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ৮শ’ টাকা।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার গাজিরহাট ইউনিয়নের কৃষক শাহাবুদ্দিন জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে পাট কাটা শুরু করবো। এই বছর বেশি ভারী বৃষ্টি হওয়ায় সেচের পানির প্রয়োজন হয়নি। উপজেলা কৃষি অফিস হতে সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা পেয়েছি।
উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা ব্লকের দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এম. এম আব্দুল্লাহ বাসস’কে জানান, চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হেক্টর, ইতোমধ্যে শতভাগ অর্জন হয়েছে। এখন পাট কাটাও শুরু হয়েছে।
দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, চলতি অর্থবছরে অত্র উপজেলায় পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ হেক্টর জমি নির্ধারিত করা হয়, যার শতভাগ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। কৃষকরা এখন পাট কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সঠিক প্রক্রিয়ায় পাটের আঁশ সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা করা হচ্ছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার জোকারচর গ্রামের কৃষক তৈয়েবুর কাজী জানান, তিনি ৪ বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছেন। প্রতি বছরই পাটের চাষাবাদ করেন। ইতোমধ্যে পাটের কর্তন শুরু করেছি। এ বছর বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ক্ষেতে পানি জমে গাছ ভেঙে পড়েছে। যে কারণে পাট কর্তনে খরচ বেশি লাগছে।
কালিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো. আলী রেজা মিঠু জানান, বড়নাল ইলিয়াছাবাদ ইউনিয়নের দায়িত্বরত ব্লকে চলতি অর্থবছরে ২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অর্জিত হয়েছে ২৭ হেক্টর। এই বছর পাটের আবাদ ভালো হয়েছে।
কালিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বাসস’কে জানান, কালিয়া উপজেলাতে চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪,৪০৮ হেক্টর, শতভাগ অর্জন সম্পন্ন হয়েছে, ইতোমধ্যে কর্তন শুরু হয়েছে। এ বছর উপজেলার ৬৫০ জন কৃষককে পাটের প্রনোদনা হিসাবে (বীজ, ডিএবি ও এমওপি সার) প্রদান করা হয়। কৃষক যেন পাট জাঁক দেওয়ার সময় কাঁদা-মাটি লাগিয়ে পাটের উজ্জ্বলতা না হারায় সেদিকে বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইল জেলার উপ-পরিচালক মো. আরিফুর রহমান জানান, চলতি অর্থবছরে নড়াইল জেলার পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩,৫০০ হেক্টর, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৩,৫১৭ হেক্টর অর্জিত হয়েছে। এ বছর পাটের আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। পাট চাষে উৎসাহী করার জন্য ৩২০০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। কৃষকদের প্রদানকৃত বীজ (তোষা, সবুজ সোনা) চমৎকার ফলন হয়েছে। এ জাতটি আগামী বছর পাট উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবু সাঈদ শুভ্র জানান, উপজেলাতে চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫,০২০ হেক্টর, শতভাগ অর্জন হয়েছে, ইতোমধ্যে কর্তন শুরু হয়েছে। এ বছর অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পাট চাষে বিকল্প পানির প্রয়োজন না হওয়ায় কৃষকের খরচ কমেছে। উপজেলার ৫শ’ জন কৃষককে পাটের প্রণোদনা হিসাবে (বীজ, ডিএবি ও এমওপি সার) প্রদান করা হয়েছে। কৃষক যেন পাট জাক দেওয়ার সময় কাদা-মাটি লাগিয়ে পাটের উজ্জ্বলতা না হারায় সেজন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চল খুলনার অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, পাট চাষে আগ্রহী করে তোলার জন্য কৃষকদের প্রণোদনা হিসাবে উন্নত জাতের পাটের বীজ ও সার প্রদান করা হয়। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিকল্প সেচের প্রয়োজন হয়নি। ফলে কৃষকের খরচ কমেছে। চলতি অর্থবছরে পাট আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই কৃষকরা পাট কাটতে শুরু করেছেন। এই অঞ্চলের পাটের সম্ভাব্য উৎপাদন ও আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কৃষকদেরকেও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বি করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।