শিরোনাম

ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি ব্যাংকিং খাতের অংশীদারদের ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানান।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাদের ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরতে অনুরোধ করছি। যদি কোনো ভুল থাকে, আমরা তা সংশোধনের চেষ্টা করব— এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আর্থিক ব্যবস্থায় অনিয়ম দূর করতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পূর্বের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে, বিশেষ করে এক-এগারো সময়কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তার দায়িত্বকাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ সবসময় সুখকর হয় না, তবে কখনো কখনো তা প্রয়োজনীয়।
তিনি বলেন, সেই সময়ে নেওয়া অনেক পদক্ষেপ কম্ফোর্টেবল বা গ্রহণযোগ্য ছিল না, কিন্তু তা প্রয়োজনীয় ছিল।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, আমানতকারীদের সুরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যাংকে যাদের আমানত বা স্থায়ী আমানত রয়েছে, তারা তাদের টাকা পাবেন। আমরা তা নিশ্চিত করেছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদ মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চাপ সত্ত্বেও অর্থনীতি স্থিতিশীল করেছে।
তিনি আরো বলেন, গত ১৮ মাসে আমরা বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে রাখার চেষ্টা করেছি। দেশের ৫৪ বছরের যাত্রা বিবেচনায় সামগ্রিক অর্জন খারাপ নয়।
অর্থ উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার সময় ৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যা থেকে আজ প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যাকে সহায়তা করতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে প্রায়ই ডেভেলপমেন্টে টেস্ট কেস হিসেবে বর্ণনা করা হয়। উত্থান-পতন সত্ত্বেও এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেনি। কেউ কেউ বিদ্যমান আইন মানেনি, আর বিবেচনামূলক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, দায়িত্বকালে তিনি কখনো স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি।
তিনি বলেন, আমি কখনো সেইভাবে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা ব্যবহার করিনি। যখন নতুন ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব এসেছিল, আমি স্পষ্টভাবে না বলেছিলাম।
তিনি বলেন, অতীতে ঋণের ভুল বণ্টন ও প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিকৃতি সৃষ্টি করেছে। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তহবিল বরাদ্দে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ যৌক্তিক মূল্যায়নের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন এবং গভর্নরের মর্যাদা পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেছেন, কাঠামোগত সংস্কারকে প্রতীকী পরিবর্তনের বাইরে যেতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু গভর্নরের মর্যাদা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাতের বিস্তৃত সংস্কার ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বোর্ডের গঠন পরিবর্তন বা সরকারি প্রতিনিধিত্ব কমানোকে জটিল নীতি সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেন, যা অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেটের বাইরে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, স্বায়ত্তশাসনকে সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আপনি স্বায়ত্তশাসন প্রয়োগে সক্ষম।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বিষয়টিকে প্রযুক্তিগতভাবে জটিল আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, যখন কোনো ব্যাংকের নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক হয়ে যায়, তখন প্রযুক্তিগতভাবে শেয়ারের মূল্য প্রভাবিত হয়। অনেকে যুক্তি দেন, শেয়ারহোল্ডাররা শেয়ার কেনার সময় বাজার ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন।
তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যেখানে সম্ভব আংশিক সহায়তা দেওয়ার অপশন বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে একীভূত ব্যাংকের শেয়ারের মাধ্যমে বা অন্যান্য প্রক্রিয়ায় একটি অংশ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এর জন্য সতর্ক আর্থিক হিসাব প্রয়োজন।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সঠিক সম্পদমূল্য ও দায় নিরূপণ ছাড়া পুরো বোঝা শেয়ারহোল্ডার বা রাষ্ট্রের ওপর চাপানো যাবে না।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সময় লাগে এবং অগ্রগতি সুসংহত ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে ভবিষ্যৎ সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা দরকার হবে।