শিরোনাম

ঢাকা, ৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনমিক্স ডিভিশন (জিইডি) আশা প্রকাশ করেছে নতুন সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিচক্ষণ পদক্ষেপ নেবে।
জিইডির সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করা।
প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন উন্নত করা, ঋণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সরকারের পরিকল্পিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প প্রস্তুতিতে দুর্বলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, জমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং সমন্বয়হীনতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি মন্থর হয়েছে।
দেশীয় চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ডিসেম্বর মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী ছিল। জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের ২.১৯ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। জিইডি আশা করছে, মৌসুমি অর্থ প্রেরণের প্রবণতার কারণে রমজান মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে।
পণ্য রপ্তানিও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত।
ডিসেম্বরে আরএমজি রপ্তানি ছিল ৩.২৩ বিলিয়ন ডলার, যা জানুয়ারিতে বেড়ে ৩.৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
একই সময়ে ডিসেম্বরের সামান্য পতনের পর অ-আরএমজি রপ্তানি বেড়ে ৭৯৮.৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কম থাকায় বোঝা যায় যে সামগ্রিক আমদানি বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতেই দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। মাছ, ফল ও সবজির দাম বাড়ায় খাদ্যব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও চালের দামে কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ দেখা গেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ডিসেম্বর ২০২৫-এ ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির কাঠামোর মধ্যে চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ডিসেম্বরের ৭.৭১ শতাংশ থেকে বেশি। অন্যদিকে একই সময়ে অখাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৩ শতাংশ থেকে ৮.৮১ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় অবদান এখনও খাদ্যখাতের। জানুয়ারিতে মোট মূল্যস্ফীতির ৪৩.০৬ শতাংশ এসেছে খাদ্যখাত থেকে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৪০ শতাংশ। আবাসন ও ইউটিলিটি খাতের অবদান ১৫.০৫ শতাংশ এবং বিবিধ পণ্য ও সেবার অবদান ৯.৩১ শতাংশ।
কিছু অখাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি হলেও ভোক্তা মূল্যসূচকে তাদের ওজন কম হওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব সীমিত ছিল।
জানুয়ারিতে চালের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কারণ চালের দামের বৃদ্ধির হার কমে এসেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অংশ ডিসেম্বরে ৩৭.৩৪ শতাংশ থেকে জানুয়ারিতে কমে ২২.১৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
সামগ্রিকভাবে জানুয়ারিতে চালের মূল্যস্ফীতি ৭.৬১ শতাংশে নেমেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১১.৯২ শতাংশ। মাঝারি, মোটা ও সরু—সব ধরনের চালেই মূল্যবৃদ্ধির হার কমেছে।
তবে সবজি, ফল ও মাছের দাম বাড়ায় চালের কারণে মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে।
ডিসেম্বরে সবজি মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক অবদান রাখলেও জানুয়ারিতে তা ইতিবাচক হয়েছে। একই সঙ্গে মাছ ও শুকনো মাছ খাদ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় অবদানকারী হিসেবে রয়েছে।
জিইডি জানিয়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পাইকারি ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে সবজির দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মজুরি বৃদ্ধি প্রায় স্থির থাকায় গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।
জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়ালেও মজুরি বৃদ্ধি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৮.০৮ শতাংশ হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.০৭ শতাংশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ফলে মূল্যবৃদ্ধি ও আয়ের প্রবৃদ্ধির মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।
প্রতিবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় মজুরি ও মূল্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে।
সংশোধিত মাসিক লক্ষ্যমাত্রা ৫২,৫৪৫ কোটি টাকার বিপরীতে এনবিআর আদায় করেছে ৩৭,০৩৩ কোটি টাকা, ফলে ঘাটতি রয়েছে ১৫,৫১২ কোটি টাকা।
সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকে ৪,৯১৪ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ ভ্যাট থেকে ৫,১৯৯ কোটি টাকা এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ৫,৩৯৯ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে জানুয়ারিতে এনবিআর তার লক্ষ্যমাত্রার ৭০.৪৮ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে।
রাজস্ব আদায় ডিসেম্বরের ৩৬,১৯১ কোটি টাকা থেকে জানুয়ারিতে বেড়ে ৩৭,০৩৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মাসভিত্তিক হিসেবে ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
তবে বছরের তুলনায় (ইয়ার-অন-ইয়ার) জানুয়ারি ২০২৫-এর তুলনায় রাজস্ব বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৮১ শতাংশ।
প্রতিবেদনটি চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতাও তুলে ধরেছে।
জিইডি জানিয়েছে, শেষ মাসগুলোতে ব্যয় বাড়ালেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হার দেখা যেতে পারে।