বাসস
  ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:০৬

মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত ব্যক্তি ও গন্তব্য শনাক্তে সরকারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ফাইল ছবি

ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আজ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত ব্যক্তি ও গন্তব্য দেশ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, ‘পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অর্থ পাচার শনাক্ত করা কঠিন কাজ। তবে আপনারা জানেন, আমরা এ বিষয়ে প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও সুসংহত করেছি।’

আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি উক্ত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। 

অবৈধ আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত করা স্বভাবতই কঠিন-এ কথা স্বীকার করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা হয়েছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মানি লন্ডারিং বিষয়ে একটি বৈঠক আহ্বান করেন, যা গত পাঁচ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ বছর পর প্রথমবারের মতো মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে এমন কোনো বৈঠক হয়নি।’

তিনি জানান, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরবর্তীতে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা যখন বিদেশে অনুরোধ জানাই, তখন তারা জানতে চায় দেশে আমরা কী করেছি। নিজেদের কার্যক্রম দেখাতে না পারলে সহযোগিতা চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বিদেশি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স) অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স সহজ নয়। এতে অসংখ্য আনুষ্ঠানিকতা ও নথিপত্র জড়িত। কোনো কোনো দেশে, যেমন জাপানে, কাগজপত্র তাদের ভাষায় অনুবাদ করতে হয়। শুধু ইংরেজিতে নথি পাঠিয়ে ফল পাওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, যারা অর্থ পাচার করে তারা অত্যন্ত দক্ষ পেশাজীবী নিয়োগ ও জটিল কৌশল ব্যবহার করে কাজ করে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতরা খুব দক্ষ লোক দিয়ে কাজ করায়। এতে লেয়ারিং, একাধিক নথিপত্র এবং জটিল আর্থিক ব্যবস্থাপনা থাকে। এগুলো শনাক্ত করতে আমাদেরও সমান দক্ষ পেশাজীবী প্রয়োজন।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শনাক্তকরণ হয়েছে। কে করেছে, কোন কোন দেশে করেছে-আমরা জানি। অনেকের একাধিক দেশের পাসপোর্ট রয়েছে। তারা কোথায় আছে, তাও আমাদের জানা।’

তবে পাচারকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ তিনি প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি নির্দিষ্ট অংকটি উল্লেখ করছি না।’

অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের সব অর্থই অবৈধ নয়।

তিনি বলেন, ‘সবাই অবৈধভাবে অর্থ পাঠায়নি। কিছু অর্থ বৈধভাবেও বিদেশে থাকতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে। যেমন-রপ্তানি আয় বা রিটেইনড আর্নিংস বৈধভাবে দেশের বাইরে থাকতে পারে।’

তার মতে, কর্তৃপক্ষ প্রায় ১১ বা ১২টি বড় মামলার তথ্য শনাক্ত করেছে এবং অন্যদের বিষয়েও তথ্য রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষিত আছে।
তিনি বলেন, ‘একটি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য রয়েছে। পরবর্তী সরকার আন্তরিক হলে এগুলো এগিয়ে নিতে পারবে।’

অর্থ উপদেষ্টা পরবর্তী সরকারকে নতুন করে সবকিছু শুরু না করে ইতোমধ্যে হওয়া অগ্রগতি সংহত করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সরকারের প্রতি আমার সবচেয়ে জোরালো অনুরোধ-এখন পর্যন্ত যা করা হয়েছে, তা সুসংহত করুন। অনেক কিছু ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে। একই বিষয় বারবার নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।’

তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন এবং আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়ের ঘাটতিগুলো তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘সরকারি দপ্তর ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এটি উন্নত করতে হবে।’

সম্পদ বিবরণী প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তিনি দুই বছর আগে নিজের সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছেন এবং বিষয়টি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জবাবদিহিতা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে। যা প্রয়োজন ছিল, আমরা জমা দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তাদের এখতিয়ার অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

অর্থ উপদেষ্টা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হলেও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ইতোমধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে।