বাসস
  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:১৭

ঢাকায় আগামীকাল শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): দেশের সম্ভাবনাময় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী করার লক্ষ্যে আগামীকাল রাজধানীতে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো ২০২৬।

আয়োজকরা জানান, এই এক্সপোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্প সক্ষমতা প্রদর্শন, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

আজ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক্সপো সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসি৪জে) প্রকল্পের সহায়তায় আগামী ২ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে এই এক্সপো অনুষ্ঠিত হবে।

প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এক্সপোটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ ও উদ্ভাবনী পণ্য প্রদর্শিত হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। 

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট হোসনা ফেরদৌস সুমি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ইসি৪জে প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুর রহিম খান।

এছাড়া অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এফবিসিসিআই, বিভিন্ন ব্যবসায়ী চেম্বার ও সংগঠনের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি ক্রেতা, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

খাতটির গুরুত্ব তুলে ধরে আবদুর রাজ্জাক বলেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, কৃষি, বস্ত্র, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, অটোমোবাইল এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সরবরাহ করে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৫০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেখানে ৩ লাখেরও বেশি দক্ষ শ্রমিক কর্মরত।

এই খাত জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে।

তিনি জানান, দেশের প্রায় ৮.২ বিলিয়ন ডলারের ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় অর্ধেকই দেশীয়ভাবে পূরণ করা হচ্ছে। যেখানে ৩ হাজার ৮০০-এর বেশি ধরনের যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ, টুলস, ডাইস, মোল্ডস ও অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং উপকরণ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে এখনও যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি হলেও প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনও ১ শতাংশের নিচে।

বর্তমানে বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত থেকে রপ্তানি আয় প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার। যথাযথ নীতি সহায়তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের রপ্তানি আয় ১২.৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই এক্সপো কেবল প্রদর্শনী নয়, এটি একটি কার্যকর সোর্সিং ও নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে। যা নির্মাতা, ক্রেতা, সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সরাসরি সংযুক্ত করবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, ব্যবসায়িক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হবে।

এক্সপোতে নির্মাণ ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট ও বস্ত্র যন্ত্রাংশ, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ডাইস ও মোল্ডসসহ হাজারো শিল্পপণ্য প্রদর্শিত হবে। এতে ৫০টির বেশি স্টলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন ও সক্ষমতা তুলে ধরা হবে।

এক্সপোর পাশাপাশি দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। একটি সেমিনারে এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে এবং অন্যটিতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বিইআইওএ সভাপতি খাতটির টেকসই উন্নয়নে বেশ কয়েকটি নীতিগত প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তিনি রপ্তানি উপযোগী হতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং শিল্পাঞ্চলে বিশেষায়িত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং জোন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, পণ্য বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ছাড়া উচ্চমূল্যের রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। এ জন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি সহায়তা জরুরি। তিনি কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো এবং সহজ আমদানি সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চীন, ভারত এবং ভিয়েতনামের থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নকশা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ও ডাই ডিজাইন সুরক্ষার জন্য সহজ, কার্যকর ও সময়োপযোগী পেটেন্ট ও ডিজাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী ও তরুণ কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানান।

এছাড়া, রপ্তানিমুখী ও রপ্তানিযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নগদ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের অগ্রাধিকার সুবিধার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কাঁচামাল আমদানির শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছেন এবং আশা করছেন সরকার শিগগিরই সমাধান দেবে।

তিনি শুল্ক কাঠামোর বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, যেখানে প্রস্তুত পণ্যের আমদানি শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ, সেখানে একই পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত। এই বৈষম্য দূর করে দেশীয় উৎপাদন সহায়তার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এই এক্সপোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্প শক্তিশালী হবে, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের দৃশ্যমানতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন। 

সংবাদ সম্মেলনে বিইআইওএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আব্দুর রশিদ, সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় পরিচালকরা এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইসি৪জে প্রকল্পের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।