শিরোনাম

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আর্থিক স্থায়িত্ব রক্ষা এবং সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে সুশাসন জোরদার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য উন্নয়নের লক্ষ্যে মধ্যমেয়াদে সমন্বিত ও ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও সংস্থাটি জোর দিয়েছে।
আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর এ অভিমত প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার পর ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আইএমএফ জানায়, দুর্বল কর রাজস্ব সংগ্রহ এবং আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক-আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সাহসী রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে উল্লেখযোগ্য নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়।
ওয়াশিংটন ডিসিতে গত ২৬ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড বাংলাদেশের জন্য আর্টিকেল-৪ পরামর্শ সম্পন্ন করে। এ সংক্রান্ত স্টাফ রিপোর্ট প্রকাশে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সম্মতি দিয়েছে। আইএমএফের আর্টিকেল অব এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, সদস্য দেশসংক্রান্ত নথি প্রকাশ স্বেচ্ছাসেবী এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্প্রতি শ্লথ হয়ে পড়েছে, যদিও মুদ্রাস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ অর্থবছরের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৪ অর্থবছরের ৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে কমে ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় উৎপাদন বিলম্ব, কঠোর নীতিমালা এবং বিনিয়োগের মন্থর গতি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরের শুরুতে মুদ্রাস্ফীতি দ্বিঅঙ্কের ঘর থেকে কমলেও অক্টোবরে তা আবারও ৮ দশমিক ২ শতাংশে (বার্ষিক ভিত্তিতে) অবস্থান করে। একই সময়ে কর রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও মূলধন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কম হওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।
চলতি হিসাবের উন্নতির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যমেয়াদে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে যাবে। কর রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবেলায় কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাবে এবং মধ্যমেয়াদে তা প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে ২০২৬ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশে থাকার পর ২০২৭ অর্থবছরে ধীরে ধীরে প্রায় ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
নির্বাহী বোর্ডের মূল্যায়ন: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রশংসা করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্বাহী পরিচালকরা। তবে তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
নির্বাহী পরিচালকরা বলেন, দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন বিনিময় হার কাঠামোর অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা একটি অসম কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এ প্রেক্ষাপটে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সিদ্ধান্তমূলক, টেকসই নীতিগত পদক্ষেপ এবং সাহসী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন পরিচালকরা। তারা বলেন, নতুন প্রশাসনের কর্মসূচির পূর্ণ মালিকানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কর্মীদের সঙ্গে প্রাথমিক ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং অংশীজনদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাহী পরিচালকরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, সাহসী কর নীতি সংস্কার, কর কাঠামো সরলীকরণ এবং কর প্রশাসন ও সম্মতি জোরদারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকি যুক্তিসঙ্গতকরণ, প্রবৃদ্ধিবর্ধক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা জাল সম্প্রসারণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারি আর্থিক ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল দ্রুত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন পরিচালকরা। এ ধরনের কৌশলে স্বল্প মূলধনীকরণের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, আর্থিক সহায়তার পরিধি নির্ধারণ এবং আইনি ভিত্তিতে শক্তিশালী পুনর্গঠন ও সমাধান পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলেন তারা। একই সঙ্গে সব পদ্ধতিগত ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং শাসনব্যবস্থা ও ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
পরিচালকরা একমত হন যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি কঠোর ও সমন্বিত নীতি মিশ্রণ বজায় রাখা জরুরি। তারা বিনিময় হার সংস্কার এবং অধিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার পূর্ণ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন এবং দুর্বল ব্যাংকে অনিরাপদ তারল্য সরবরাহের বিষয়ে সতর্ক করেন।
তারা বলেন, মুদ্রাস্ফীতি দৃঢ়ভাবে নিম্নমুখী ধারায় না আসা পর্যন্ত মুদ্রানীতি যথাযথভাবে কঠোর রাখা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে মুদ্রানীতি কাঠামোর আধুনিকীকরণ অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বাহী পরিচালকরা আরও উল্লেখ করেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা জোরদার, দুর্নীতি দমন, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল/সিএফটি) কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তারা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি—বিশেষ করে তরুণদের জন্য—এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের সক্ষমতা উন্নয়ন ও মানোন্নয়নকে অপরিহার্য বলে মত দেন পরিচালকরা।
আরএসএফ ব্যবস্থার আওতায় সংস্কারের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অর্থায়ন সমন্বয়ে সহায়ক হতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
আইএমএফের চুক্তির ধারা-৪ অনুযায়ী, সংস্থাটি সাধারণত প্রতি বছর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে থাকে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে অর্থনৈতিক ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিমালা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে। পরবর্তীতে সদর দপ্তরে ফিরে কর্মীরা একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, যা নির্বাহী বোর্ডের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলোচনা শেষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডের সভাপতি হিসেবে নির্বাহী পরিচালকদের মতামতের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান।