বাসস
  ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:৩৪

সারের দাম কারসাজি রোধে নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬(বাসস): কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে ডিলারদের মাধ্যমে সারের দাম কারসাজি রোধে নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গবেষণা।

গবেষণায় অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে স্থানীয় কৃষি অফিসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে উচ্চফলনশীল দেশীয় পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে গবেষণায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট ও গভর্নরের দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের ভ্যালু চেইন দক্ষতা (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনটি আজ প্রকাশ করা হয়েছে।

জরিপের আওতায় ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলার পাঁচটি কৃষিপণ্য-ধান/চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম পর্যালোচনা করা হয়। জরিপটি ২০২৫ সালের ১৫ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত হয়। 

এরপর, ২০২৫ সালের জুলাই এবং আগস্টের শুরুতে প্যারাগন, নারিশ, এসিআই এবং আকিজসহ কিছু নির্বাচিত বড় করপোরেট কোম্পানির প্রধান কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই প্রতিবেদনে মূলত জরিপের প্রাপ্ত ফলাফল, এর পেছনের কারণ, খরচ ও মূল্যের গতিশীলতা এবং ঋতুভিত্তিক প্রভাবগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. সেলিম আল মামুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ওপর একটি উপস্থাপনা প্রদান করেন।

চালের বাজারের মূল্য ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে গবেষণায় সরু চালের ওপর থেকে অবিলম্বে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, ধানের সর্বোচ্চ গুণমান নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত প্রতিটি অঞ্চলে স্বয়ংক্রিয় ধান শুকানোর যন্ত্র (প্যাডি ড্রায়ার) স্থাপন করা এবং রাইস মিলগুলোকে এই মেশিন স্থাপনে উৎসাহিত করা।

বাজার পরিচালনার বিষয়ে গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট শর্তে মিলারদের ধান মজুত করার অনুমতি দেবে, যেখানে তাদের প্রতি ১৫ থেকে ৩০ দিন অন্তর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল বাজারে ছাড়তে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই প্রক্রিয়াটি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা উচিত এবং সমস্ত লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়া উচিত। এছাড়া ভুট্টা চাষের ওপর থেকে প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং রাইস ব্র্যানের ওপর থেকে রপ্তানি শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন-এই বিষয়টি মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

পেঁয়াজের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৪.০ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য একটি ‘রিফাইনান্স উইন্ডো’ চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা স্টোরেজ সুবিধা তৈরি করতে পারেন। এই সুবিধাগুলোর খরচ হবে ৮৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের এয়ার ফ্লো মেশিন প্রযুক্তির ভর্তুকির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং পচন ও ওজন হ্রাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

আলুর ক্ষেত্রে বড় পরিসরের চাষিদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি রিফাইন্যান্স স্কিম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে অবিলম্বে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমের জন্য আলু ক্রয় শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পোলট্রি খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে গবেষণায় ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। ভারত ও কানাডার মতো দেশের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নীতি ক্ষুদ্র খামারিদের অন্যায্য প্রতিযোগিতা ও বাজার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ-কর্পোরেট খামারিদের আরও সহায়তার জন্য প্রতিবেদনটিতে অ-কর্পোরেট পোল্ট্রি খাতকে ‘কৃষি খাত’ হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে, যার ফলে তারা বিদ্যুৎ বিল, ট্যাক্স এবং ঋণে বিশেষ ছাড় পাবে। নির্দিষ্ট আর্থিক সুপারিশের মধ্যে রয়েছে উচ্চ-ব্যয়কালীন সময়ে খাদ্য ও বাচ্চা কেনার জন্য এবং করপোরেট উৎপাদকদের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য ফিড মিল স্থাপনে ভর্তুকিযুক্ত ঋণ প্রদান।

এছাড়া পবিত্র ঈদুল আযহার মতো বড় উৎসবের পর উদ্বৃত্ত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারকে একটি জাতীয় বাফার স্টক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।