শিরোনাম

\ আবু মোশাররফ \
চট্টগ্রাম, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : একপাশে বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত, যেখানে নীলাভ জলরাশি থেকে একের পর এক রুপালি ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। ঠিক তার বিপরীত পাশে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ-শ্যামল ঘন পাহাড়; কোথাও উঁচু-নিচু টিলা, আবার কোথাও বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকিয়ে থাকা শান্ত গ্রামীণ জনপদ। এই দুই বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক ক্যানভাসের বুক চিরে সর্পিল গতিতে এগিয়ে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক।
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর স্নিগ্ধ প্রকৃতি একে করে তুলেছে আরও বেশি অনিন্দ্যসুন্দর। প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্যে এখন মাতোয়ারা দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক।
কক্সবাজার শহরের কলাতলী ডলফিন মোড় থেকে শুরু হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো পথ জুড়েই দুই পাশে ছড়িয়ে রয়েছে মুগ্ধতার হাতছানি। একদিকে সাগরের উত্তাল গর্জন, অন্যদিকে পাহাড়ের আদিম নীরবতা—দুই বৈরিতার মাঝে পিচঢালা পথে ছুটে চলার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যেন প্রকৃতির নিজস্ব তুলিতে আঁকা এক দীর্ঘ মহাকাব্য।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভাদ্রের আকাশে তখন মেঘের আনাগোনা—কখনো রোদ, কখনো হালকা বৃষ্টি। এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে সবার শরীর, কখনো হালকা বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে গায়ে-মুখে, আবার কয়েক মিনিট পরই মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে আলো। তাতে সড়কের দুই পাশে ভেজা সবুজ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে বৃষ্টির পানি, কোথাও সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে পর্যটকবাহী কোনো গাড়ি। আর এই দৃশ্য দেখতে, ছবি তুলতে কিংবা নিছক প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতেও মেরিন ড্রাইভে ছুটে আসছেন দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক।
শরতের মেঘ-বৃষ্টি মেরিন ড্রাইভে পর্যটকদের উপস্থিতি কমাতে পারেনি, বরং অনেকের কাছে বৃষ্টিই হয়ে উঠেছে ভ্রমণের বাড়তি আনন্দ।

মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য পর্যটকদের স্মৃতিতে অম্লান করে দিতে কলাতলী মোড়ে গড়ে উঠেছে ছাদখোলা চাঁদের গাড়ি (স্থানীয় ভাষায় জিপ) আর ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক স্টেশন। সেখান থেকে পর্যটকরা প্রয়োজন মতো গাড়ি ভাড়া করে উপভোগ করতে পারেন পৃথিবীর দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের পাশঘেঁষে বয়ে চলা এই সড়কের দীর্ঘ ভ্রমণবিলাস।
ডলফিন মোড়ে ‘পর্যটন গাড়ি’ ব্যবস্থাপনায় থাকা আবুল কালাম বাসসকে জানান, গাড়িগুলো ঘণ্টা এবং সারাদিনের হিসেবে ভাড়ায় চলাচল করে। সাধারণ ১০-১২ জন চড়তে পারেন এমন একটি গাড়ি সারাদিনের জন্য ভাড়ায় নিলে গুণতে হবে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। ঘণ্টা হিসেবে নিলে মিনিমাম ৬ ঘণ্টার জন্য গুণতে হবে ২ হাজার টাকা। বর্তমানে এখান থেকে প্রতিদিন হাজারেরও বেশি ট্রিপ (প্রতিবার) ভাড়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডলফিন মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে এগোলেই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে সামনে খুলে যায় দীর্ঘ সড়ক। একদিকে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পাহাড়ি সবুজ। কোথাও সমুদ্র একেবারে সড়কের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কোথাও আবার বালুকাবেলা ও ঝাউবনের আড়াল। ফলে কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানেই বদলে যায় প্রকৃতির রং ও দৃশ্যপট।
পর্যটকদের কাছে মেরিন ড্রাইভের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এই বৈচিত্র্য। একই যাত্রায় সমুদ্র, পাহাড়, বন, গ্রামীণ জীবন ও বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি—সবকিছুর দেখা মেলে এখানে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের সবুজ যখন আরও ঘন হয়ে ওঠে, তখন মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য যেন নতুন মাত্রা পায়।
মেরিন ড্রাইভের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে শরতের প্রকৃতি। সে কারণে পর্যটকরা পথজুড়েই মুগ্ধতায় থমকে যান। পথ যেতে যেতে পর্যটকেরা কখনও সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখনো পাহাড়ের ছবি তুলেন। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী চাঁদের গাড়ির চালকরা যেখানেই ইচ্ছে সংকেত পেলেই থেমে যান। তারপর সেখানে নেমে পড়ছেন পর্যটকরা। গাড়ি চলতে শুরু করছে ছাদখেলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তরুণ-তরুণী পর্যটকরা।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পর্যটক রাকিব হাসান বাসসকে বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভে আসার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো এক সঙ্গে সমুদ্র আর পাহাড় দেখা। গাড়ি চলতে থাকে আর দুই পাশে দুই রকমের প্রকৃতি। এরকম অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও খুব একটা পাওয়া যায় না।’

চট্টগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চারা সমুদ্র দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু মেরিন ড্রাইভে এসে পাহাড় আর সবুজ দেখে তারাও মুগ্ধ। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, তারপরও সবাই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলেছে।’
ভাদ্রের হালকা বৃষ্টি মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। বৃষ্টির পানি ধুয়ে দিয়েছে সড়কের দুই পাশের ধুলো। পাহাড়ের সবুজ আরও সতেজ, আরও গাঢ়। দূরের পাহাড় কখনো মেঘে ঢাকা পড়ছে, আবার বাতাসের সঙ্গে মেঘ সরে গেলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পাহাড়ের রেখা। এই সময়টাতে অনেক পর্যটকই ইচ্ছাকৃতভাবে মেরিন ড্রাইভে বের হচ্ছেন। তাদের কাছে বৃষ্টি কোনো বাধা নয়, বরং ভেজা প্রকৃতিকে দেখার একটি বাড়তি সুযোগ।
ইনানী পর্যটন স্পটে জার্মানির পর্যটক ম্যাক্সিমিলিয়ান ইয়েনাস বাসসকে বলেন, ‘দ্যা কম্বিনেশন অব সি এন্ড রেইন মেইকস দিজ রোড ভেরি স্পেশাল।’ তার মতে, সমুদ্রের পাশ দিয়ে পাহাড়ের মাঝখানে দীর্ঘ পথ চলার অভিজ্ঞতা খুবই আকর্ষণীয়।
ইয়েনাস সপরিবারের কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছেন। তিনি একজন ভ্রমণবিষয়ক ভøগারও। ইনানীর সৌন্দর্য ভিডিওতে ধারণ করতে করতে তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলছিলেন। এ সময় তার স্ত্রী ও সন্তানরা সাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন।
মেরিন ড্রাইভে দেখা গেল, চোখের সামনে সাঁই সাঁই করে চলছে মোটরবাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ি। খবর নিয়ে জানা গেল, অনেকেই সড়কটিতে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঘুরতে আসছেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার অনেকে একাই বেরিয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ে।
হিমছড়ি পয়েন্টে বাইক আরোহী পর্যটক তানভীর আহমেদ বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভে আসলে কোথায় থামব, সেটা ঠিক করা কঠিন। কারণ একটু পরপরই নতুন কোনো দৃশ্য সামনে আসে। কোথাও সমুদ্র সুন্দর লাগছে, আবার কিছুদূর গেলে পাহাড়ের দৃশ্য মন কেড়ে নিচ্ছে।’
প্রকৃতির পাশাপাশি গ্রামীণ জীবন
মেরিন ড্রাইভ শুধু সাগর আর পাহাড়ের গল্প নয়। এর দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামীণ জনপদও এই সড়কের সৌন্দর্যের অংশ। ছোট ছোট ঘরবাড়ি, স্থানীয় মানুষের চলাচল, পাহাড়ি ছড়ায় জাল পেতে মাছ ধরা, পাহাড়ের পাদদেশের সবুজ, কোথাও কৃষিকাজ— সব মিলিয়ে পর্যটকের চোখে ধরা পড়ে কক্সবাজারের অন্য এক জীবনচিত্র।
স্থানীয় সাংবাদিক জসিম উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘কক্সবাজার মানে শুধুই দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত—এই পরিচিত ধারণার বাইরে মেরিন ড্রাইভ পর্যটকদের সামনে এখানকার আরেকটি রূপ তুলে ধরেছে। সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড় ও গ্রামীণ প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে। ফলে অনেক পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনায় এখন মেরিন ড্রাইভ একটি অপরিহার্য অংশ।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ ঘিরে ছোট ব্যবসা, খাবারের দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটন সেবার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিবেশের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। কারণ মেরিন ড্রাইভের আসল আকর্ষণ কোনো কৃত্রিম স্থাপনা নয়। এর শক্তি প্রকৃতির নিজস্ব বৈচিত্র্যে—এক পাশে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে আঁকাবাঁকা সড়ক।’