শিরোনাম

রাজশাহী, ২০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : রাজশাহী শহর সবুজে ঘেরা হলেও শিমলা পার্কের সবুজ প্রকৃতি যেন অন্যরকম। ঘন বৃক্ষরাজি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সমৃদ্ধ এই পার্কটি শুধু মনোরমই নয়, বরং এটি নানা প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, বছরের অধিকাংশ সময় এ এলাকায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির বিচরণ ঘটে।
বিশেষ করে বর্ষা ও শীত মৌসুমে এখানে দেশীয় ও পরিযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে চখাচখি, কবুতর, ঘুঘু, কুবো, আবাবিল, লালঠেঙ্গি, পানকৌড়ি, গাঙচিল, বক, কাঠঠোকরা, ফিঙে, টিয়া, মাছরাঙা, শালিক, দোয়েল, মৌটুসি, চড়ুই, খঞ্জনা, বুলবুলি, হলুদ পাখি, ডাহুক, কোকিলসহ অসংখ্য পরিচিত ও অচেনা পাখি।
এ ছাড়া এলাকায় ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে খরগোশ, কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, গন্ধগোকুল, বড় গন্ধগোকুল, মেছোবাঘ, বেজি, শিয়াল এবং বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড় উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে ২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, যেমন কচ্ছপ, গিরগিটি, টিকটিকি ও বিভিন্ন ধরনের সাপ এবং ১৩ প্রজাতির উভচর প্রাণী।
এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা পরিষদের ৪১তম সভায় রাজশাহী জেলার পদ্মার চরে অবস্থিত শিমলা পার্ককে **বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একই সভায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বারবিলা বিল এবং রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাবুডাইং পর্যটন ও পিকনিক স্পটকেও বিশেষ জীববৈত্র্র্যি সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার আওতায় শিমলা পার্কের বিজিবি ক্যাম্প-সংলগ্ন অংশ থেকে জেলা প্রশাসকের বাংলো-সংলগ্ন শহর রক্ষা বাঁধ পর্যন্ত প্রায় ১৭ একর এলাকা অন্তর্ভুক্ত হবে।
জীববৈত্র্র্যি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্রুত সম্প্রসারণশীল রাজশাহী শহরের মধ্যে এমন একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা গেলে তা পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষা ও প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
ফলে শিমলা পার্ককে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা রাজশাহীবাসীর জন্য পরিবেশ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে দর্শনার্থীদের জন্য কিছু করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- নীরবতা বজায় রাখা, জীববৈত্র্র্যি সংরক্ষণে সহযোগিতা করা, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথে বাধা না দেওয়া, পড়ে থাকা গাছ বা ডাল সংগ্রহ না করা, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা, পাখির বাসা নষ্ট না করা, প্রকৃতির ক্ষতি না করে উপভোগ করা, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, বন্যপ্রাণীর খুব কাছে না যাওয়া এবং প্রাণী শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস বা হয়রানির ঘটনা দেখলে প্রশাসন বা বন বিভাগকে জানানো।
অন্যদিকে সংরক্ষিত এলাকায় মাইক বা উচ্চস্বরে গান বাজানো, দলবদ্ধ হইচই বা আলোকসজ্জা করা, পলিথিন ও প্লাস্টিকসহ অপচনশীল বর্জ্য ফেলা, পিকনিক, রান্না বা আগুন জ্বালানো, পাখি ও বন্যপ্রাণী বিরক্ত বা শিকার করা, গাছ কাটা বা ডালপালা ভাঙা, স্থায়ী বা অস্থায়ী দোকান স্থাপন, গবাদিপশুর অবাধ প্রবেশ ও চারণ, অপ্রয়োজনীয় শব্দ বা আলোর ব্যবহার এবং লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় ও ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ বা ধ্বংস করা নিষিদ্ধ থাকবে।
বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকাগুলো বিরল উদ্ভিদ, প্রাণী ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গত ৮ জুলাই বিভাগীয় কমিশনার ড. এ. এন. এম. বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত বিশেষ জীববৈচিত্র্য এলাকা সংরক্ষণ ও উন্নয়নবিষয়ক এক সভায় রাজশাহীর জনগণকে এ সংরক্ষিত এলাকা রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়।