বাসস
  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪১

মেহেরপুরের দেড়শ’ বছরের ঐতিহ্য ১০ গম্বুজ মসজিদ

মেহেরপুরের দেড়শ’ বছরের ঐতিহ্য ১০ গম্বুজ মসজিদ। ছবি: বাসস

\ দিলরুবা খাতুন \

মেহেরপুর, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা মেহেরপুর জেলার এক শান্ত সবুজ গ্রাম আনন্দবাস। গ্রামের ভোর জাগে পাখির ডাক আর আজানের ধ্বনিতে। সেই ধ্বনির কেন্দ্র বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরোনো আনন্দবাস ১০ গম্বুজ মসজিদ। ইবাদতের স্থান হয়েও যা কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। স্থানীয়দের মুখে মুখে শোনা যায়, ইসলাম প্রচারক দরবেশদের প্রভাবে এই অঞ্চলে ধর্মীয় চর্চা বিস্তৃত হয়। তাদেরই একজন শেখ ফরিদের অনুপ্রেরণায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে লিখিত কোনো দলিল না থাকলেও প্রবীণদের স্মৃতিতেই টিকে আছে নির্মাণের ইতিহাস।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইবনে সুয়ায়েজ মামুন বাসস’কে জানিয়েছেন, আবুল মাস্টার, মফেম উদ্দীন মণ্ডল ও জিন্দার আলীসহ গ্রামের মুরুব্বিরা দীর্ঘদিন মসজিদটির দেখভাল করেছেন। তাদের উত্তরসূরিরাই এখন দায়িত্ব পালন করছেন।

বয়োবৃদ্ধ হাসেম আলী বলেছেন, আমরা শুনেছি আমার বাবার-দাদার আমলে পূর্বপুরুষরাই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্যে স্বাতন্ত্র নামেই পরিচয় ১০ গম্বুজ মসজিদ। সারিবদ্ধ গম্বুজের নকশা গ্রামীণ স্থাপত্যে বিরল।

মসজিদের ইমাম মাওলানা সালাহ উদ্দীন বলেছেন, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের চেয়েও আমাদের একটি গম্বুজ আকারে বড়। এটিই আমাদের গর্ব। লালচে ইটের গাঁথুনি, প্রশস্ত নামাজঘর ও খোলা প্রাঙ্গণ সব মিলিয়ে মসজিদটি গ্রামীণ ঐতিহ্য ও স্থাপত্য রুচির অনন্য উদাহরণ। সময়ের পরিক্রমায় সংস্কার হয়েছে, কিন্তু মূল কাঠামোর ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছেন স্থানীয়রা।

মসজিদের নিকটবর্তী সনাতন ধর্মের জয়দেব শর্মা’র বয়ানে- আমার দাদুরা এই মসজিদ দেখেছেন। বহু বছর আগে স্থাপিত হয় এই মসজিদ। তখন ১০ গম্বুজ থাকা স্থানটুকুই ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রেখে সামনের অংশে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতল ভবন এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়।

হাসেল উদ্দিন বিশ্বাস বলেছেন, গ্রামে ৬টি নতুন মসজিদ নির্মিত হলেও প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে আসেন। শুধু নামাজ নয়, পারস্পরিক কুশল বিনিময়, সামাজিক আলাপ-আলোচনা। সব মিলিয়ে মসজিদটি হয়ে ওঠেছে মিলনমেলাস্থল।

বয়োবৃদ্ধ আব্দুল করিম বলেছেন, এই মসজিদ আমাদের গর্ব। দুর দুরান্ত থেকে মানুষ আসে এই মসজিদটি দেখার জন্য। মোয়াজ্জিন ময়েন উদ্দীনও একই অনুভূতির কথা জানান। প্রভাব ও প্রসার স্থানীয়দের মতে, ১০ গম্বুজ মসজিদকে কেন্দ্র করেই এলাকায় ইসলামের শিক্ষা ও চর্চা বিস্তৃত হয়েছে। এই মসজিদের আদলে আশপাশে আরও কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই প্রাচীন স্থাপনা।

দেড়শ’ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী মসজিদটি এখনো স্থানীয় উদ্যোগেই টিকে আছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রত্নতাত্ত্বিক বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি হতে পারে জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন। আনন্দবাসের ১০ গম্বুজ মসজিদ তাই কেবল ইট-সুরকির স্থাপনা নয়- এটি একটি গ্রামের আত্মপরিচয়। প্রার্থনার প্রশান্তি আর মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধনের প্রতীক।