বাসস
  ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১৬

স্নিগ্ধ ও ছায়াশীতল ইনানীর ঝাউবন স্থানীয়দের আয়ের উৎস

ছবি: বাসস

॥ আবু মোশাররফ ॥

চট্টগ্রাম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বাসস) : সমুদ্রের নীল জলরাশি আর উঁচু-নিচু ঢেউ তখনও কিছুটা দূরে, সামনে বিস্তীর্ণ বালুচর, পথের ধারে সারি সারি ঝাউগাছ। গাছগুলোর নিচে হঠাৎ চোখ আটকে যায় অন্য এক দৃশ্যে। ঝাউবনের গাছে গাছে টানানো মোটা দড়ির জাল। অনেকেই আরাম করে শুয়ে বা দোল খেয়ে সময় কাটাচ্ছেন।

আবার কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলছেন, আবার কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন সমুদ্রের দিকে। পর্যটন শহর কক্সবাজারের উখিয়ার সোনাপাড়া এলাকার সমুদ্র সৈকতে ঝাউগাছের ভিন্ন এক দৃশ্য দেখে থেমে যান অনেক পর্যটক।

দুই পাশের গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে মাঝ খানে জালের মতো করে বোনা হয়েছে দোলনা। সেখানে শুয়ে থাকা যায় বেশ আরাম করে। ঘণ্টা হিসেবে এর ব্যবহার করতে গুণতে হয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা। আর এই অভিনব আয়োজন একদিকে পর্যটকদের দিচ্ছে নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে স্থানীয় কিছু মানুষের জন্য তৈরি করেছে ছোট্ট আয়ের পথও। দীর্ঘ সময় সৈকতে হাঁটাহাঁটি কিংবা ঘোরাঘুরির পর পর্যটকরা এই জালে শরীর ছেড়ে দিয়ে যেন খানিকটা বিশ্রামের অবকাশ খুঁজে পান। কারও কাছে এটি নিছক বিনোদন, কারও কাছে ক্লান্ত শরীরকে একটু আরাম দেওয়ার জায়গা; আবার কারও চোখে ঝাউবনের নিচে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকার এই অভিজ্ঞতা অনেকটা ‘প্রাকৃতিক স্পা’র মতো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইনানী সৈকতে নতুন এই আয়োজনের আরেকটি দিকও আছে। বড় কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই ঝাউগাছ, রশি আর জালকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষ তৈরি করেছেন আয়ের একটি ছোট উৎস; যাদের বেশিরভাগই আবার সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও শিশু-কিশোর। পর্যটক যতক্ষণ জালে থাকেন, ততক্ষণই আয়। ফলে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগের এই অভিনব পদ্ধতি একদিকে বদলে দিচ্ছে পর্যটকের সৈকত অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বালুচরে তৈরি হয়েছে স্থানীয় প্রান্তিক কিছু মানুষের ক্ষুদ্র আয়ের সুযোগ।

অভিজ্ঞজনরা বলছেন, সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, খোলা বাতাস এবং ঝাউবনের ছায়ার কারণে এখানে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলে শরীর ও মন বেশ প্রশান্ত লাগে। তবে এটি কোনো চিকিৎসা বা বৈজ্ঞানিক ‘স্পা’ নয়; পর্যটকদের কাছে আরাম করে সময় কাটানোর নতুন একটি বিনোদন হিসেবেই এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

একটি দোলনার মালিক কিশোর নূরে আলম বাসস বলেন, ‘বেড়াতে আসা লোকজন প্রথমে অবাক হয়ে তাকান। পরে জিজ্ঞ্যেস করেন, এখানে শোয়া বা বিশ্রাম করা যাবে কি-না। ভাড়ার কথা বললে অনেকে এক ঘণ্টার জন্য নিয়ে নেন। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে বিকেলের দিকে ভিড় বেশি হয়।’

আরেকজন বলেন, ‘জালগুলো সকালের দিকে গাছে টানানো হয়, সন্ধ্যার পর আবার খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন কিছু টাকা আয় হয়।’
সমুদ্র সৈকতে এসে পর্যটকরা সাধারণত পানিতে নামেন, বালুচরে হাঁটেন কিংবা ছবিও তোলেন। কিন্তু এই জালের অভিজ্ঞতা একটু আলাদা। এই জালের দোলনায় শুয়ে সামনের সমুদ্র দেখা।

এক পর্যটকের ভাষায়, ‘জিনিসটি ভিন্ন রকম দেখে থামলাম। প্রথমে নতুন লাগল, পরে শুয়ে দেখলাম বেশ আরাম। সামনে সমুদ্র, মাথার ওপরে ঝাউগাছ—অন্যরকম একটা অনুভূতি।’

শুধু বিশ্রাম নয়, এসব জালের দোলনা  এখন পর্যটকদের ছবি তোলারও আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এর ওপর শুয়ে কিংবা বসে পেছনে সমুদ্র ও ঝাউগাছ রেখে ছবি তুলছেন অনেকে। কেউ একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক জসিম উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘এটি স্থানীয় মানুষের ছোট একটি উদ্যোগ। পর্যটকরা এতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং স্থানীয় কিছু মানুষও আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে গাছের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশ ঠিক রেখে এমন উদ্যোগ পর্যটনের অভিজ্ঞতাকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের ঢেউয়ের পাশে ঝাউবনের ছায়ায় এই নতুন আয়োজন তাই কেবল পর্যটকের বিনোদন নয়; স্থানীয় মানুষের সৃজনশীলতারও একটি উদাহরণ। প্রকৃতিকে খুব বেশি বদলে না দিয়েই কিভাবে তাকে ঘিরে ছোট আয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়, ইনানীর এই রশির জাল তারই একটি ছোট্ট নমুনা।’