শিরোনাম

পটুয়াখালী, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : বৈরী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর কৃষকদের। তবে কয়েক দফা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা কাটিয়ে চলতি মৌসুমে আমন ধানের আবাদকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ধারাবাহিক বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে আমনের বীজতলা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে চারা রোপণ কার্যক্রম জোরেশোরে এগিয়ে চলছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর। এমন প্রেক্ষাপটে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জনের পাশাপাশি তা ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্যে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিপুল পরিমাণ আমনের বীজতলা তৈরি করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোথাও কোথাও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অধিকাংশ এলাকায় কৃষকরা বিকল্প বীজতলায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আমনের আবাদ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রাথমিক শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। জুলাই ও আগস্টে নিম্নচাপ, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু, টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে আমনের বীজতলাসহ গ্রীষ্মকালীন সবজির বেশ ক্ষতি সাধন হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে তখন প্রায় ১৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বাউফল উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক বেল্লাল মিরা (৬৫) বাসস’কে বলেন, এ বছর ৮০ কাঠা জমিতে আমন রোপণ করেছি। গত বছর রোপণ করেছিলাম ৬০ কাঠা জমিতে। কারণ, গত বছর বীজতলা আশানুরুপ করতে পারিনি। তবে এবার আশা করছি, আমনের ফলন ভালো পাব।
দশমিনা উপজেলার কৃষক মো. শাহ আলম হাওলাদারও আমন বীজ দিয়ে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির ওপর অনেকটাই আমাদের নির্ভর করতে হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’
বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ও নাজিরপুর ইউনিয়নের কৃষক জয়নাল মিরা (৭০), জাকির মোল্লা (৪৫) ও কুদ্দুছ মোল্লা (৬৫) বাসস’কে বলেন, এবার গত বছরের চেয়ে বেশি জমিতে আমন রোপণ করেছি। কারণ, বীজতলায় খরচ কম লেগেছে। রোপণের পরে সার দেয়ার আগেই কালো-ঘন হয়ে আমন বেড়ে উঠছে, এতে আনন্দ লাগছে। আশা করি, ভালো ফলন পাব।
মির্জাগঞ্জ উপজেলার কৃষক মো. জাকির হোসেন (৪০) বাসস’কে বলেন, আমন ধানের ফলন ভালো হলে কৃষকের ঘরে যেমন ধান উঠবে, তেমনি পরিবারের খরচ মেটানোও সহজ হবে। বিগত বছরের চাইতে এবার বীজতলা পর্যাপ্ত করেছি। তাই আমরা কৃষকরা এখন জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে অনেক ব্যস্ত আছি।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর কৃষি মূলত আবহাওয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, নিম্নচাপ ও জোয়ারের পানির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবছরই কৃষকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তবে উন্নত জাতের বীজ, সময়মতো বীজতলা তৈরি, দ্রুত চারা রোপণ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ গ্রহণের কারণে এসব ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমেও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ মাঠ আমনের সবুজে ভরে উঠবে। সব ঠিক থাকলে এবার আগের সব উৎপাদনের রেকর্ড ভাঙা সম্ভব হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আবাদ সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত জমিতে আমন চাষ হলে তা জেলার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বাসস’কে বলেন, এবার বাউফল উপজেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৩৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর। আমরা আশা করি, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে।
তিনি জানান, বীজতলা খুবই ভালো আছে। আমন আবাদে কোনো ঘাটতি হবে না বলে আশা করি। কৃষি কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সুষম সার প্রয়োগ, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারসহ সময়মতো চারা রোপণের বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. মো. আমানুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, ‘এবার বীজতলা পর্যাপ্ত হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর। আমরা আশা করছি, পুরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। বরং আবাদ শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত চারা থাকবে। বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।’
তিনি বলেন, পটুয়াখালী জেলার ৮টি উপজেলার কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ, বালাই ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো চারা রোপণের বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করছেন। ফলে আমনের আবাদ ও উৎপাদন দুটোই ভালো হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।