শিরোনাম

দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ
কুমিল্লা, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): কুমিল্লার চর্থা। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও এখানে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের ইতিহাসের সাক্ষী একটি বাড়ি।
সময়ের বিবর্তনে রাজপরিবারের সেই পুরোনো স্থাপনার অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তবুও ইতিহাসের পাতায় এর গুরুত্ব একটুও কমেনি। কারণ, এই বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতস্রষ্টা, গায়ক ও সুরকার শচীন দেব বর্মণের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি।
বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতাঙ্গনে যাঁর সৃষ্টিশীলতা কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে, সেই ‘শচীন কর্তা’র জন্ম কুমিল্লার চর্থায়। লোকসংগীত, বিশেষ করে ভাটিয়ালি, সারি ও বাংলার মাটির সুরকে শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে সৃজনশীলভাবে মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক সংগীতধারা।
তাঁর কণ্ঠ ও সুরে কুমিল্লা তথা বাংলার লোকজ জীবনের যে আবহ উঠে এসেছে, তা তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে স্বতন্ত্র আসন দিয়েছে।
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার চর্থার গোলপুকুরপাড়ে জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মণ। ত্রিপুরা রাজপরিবারের দেব বর্মণ বংশে জন্ম হলেও তাঁর শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে কুমিল্লায়। পিতা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মণ এবং মাতা নিরুপমা দেবীর সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
শৈশবেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। কুমিল্লার নদী, মাঠ, গ্রাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর সংগীতচেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গোমতী নদীর পাড়ের মাঝিদের গান, ভাটিয়ালি, সারি, বাউলসহ নানা ধরনের লোকসুর তাঁর মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি সেই লোকজ সুরকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান।
শচীন দেবের শিক্ষাজীবনেরও বড় অংশ কেটেছে কুমিল্লায়। তিনি কুমিল্লার ইউসুফ স্কুল ও কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়ন করেন। সংগীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি সংগীতকেই জীবনের প্রধান সাধনা হিসেবে বেছে নেন।
তাঁর সংগীতগুরুদের মধ্যে ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খান ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো বিশিষ্ট শিল্পী। শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর সাধনার পাশাপাশি বাংলার লোকসংগীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। এই দুই ধারার সৃজনশীল সমন্বয়ই পরবর্তীতে তাঁর সংগীতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
কুমিল্লা থেকে শুরু হওয়া সেই সংগীতযাত্রা একসময় তাঁকে কলকাতা হয়ে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন এবং নিজের স্বতন্ত্র সুরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন অনন্য এক অবস্থান। তাঁর সুরারোপিত ‘পিয়াসা’, ‘গাইড’, ‘বন্দিনী’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘আরাধনা’সহ বহু চলচ্চিত্রের গান ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মান্না দে, গীতা দত্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ উপমহাদেশের বহু কিংবদন্তি শিল্পী তাঁর সুরে গান গেয়েছেন। নিজের কণ্ঠেও তিনি অসংখ্য গান গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তাঁর কণ্ঠে বাংলার লোকগানের যে মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, সেটিই ছিল তাঁর সংগীতের অন্যতম শক্তি।
শচীন দেব বর্মণের পারিবারিক জীবনও সংগীতজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর স্ত্রী মীরা দেব বর্মণ ছিলেন গীতিকার। তাঁদের একমাত্র সন্তান রাহুল দেব বর্মণ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে নিজস্ব বিপ্লব ঘটান। পিতা-পুত্র দুজনের সৃষ্টিশীলতা ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে আলাদা অধ্যায় তৈরি করেছে।
সংগীতের জন্য অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন শচীন দেব বর্মণ। এর মধ্যে রয়েছে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার এবং ভারতের পদ্মশ্রী সম্মাননা। ১৯৬৯ সালে তিনি পদ্মশ্রী লাভ করেন। তাঁর সংগীতজীবনের বিস্তৃতি ছিল কয়েক দশকজুড়ে। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে তাঁর সৃষ্টি ও সুর আজও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
শচীন দেব বর্মণের জন্মভিটা একসময় ছিল বৃহৎ পরিসরের রাজপ্রাসাদসদৃশ স্থাপনা। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে বাড়িটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবহেলা ও অযত্নে একসময় জায়গাটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, একপর্যায়ে বাড়ির আশপাশে মাদকসেবীদের আনাগোনাও বেড়ে যায়।
কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রচেষ্টার পর বাড়িটির একটি অংশ সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাড়িটির চেহারায় এসেছে পরিবর্তন। সংস্কারের পর এখানে শচীন দেব বর্মণের জীবন, সংগীত ও পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের পাশেই শচীন দেব বর্মণের বড় আকারের একটি ম্যুরাল। দর্শনার্থীরা সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে নতুন করে সাজানো অংশ মিলিয়ে বাড়িটিতে তৈরি হয়েছে একটি স্মৃতিবহ আবহ।
ভেতরে প্রবেশ করলেই শচীন দেব বর্মণের বড় দু’টি ছবি দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। দেয়ালে রয়েছে তাঁর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। আলাদা অংশে রয়েছে শৈশব, কৈশোর, কর্মজীবন, দাম্পত্য জীবন, পুরস্কার ও সংগীতজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোকচিত্র ও তথ্য।
পুরোনো উঁচু ছাদের বাড়িটির ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে দর্শনার্থীরা শচীন দেব বর্মণের গান শুনতে পারেন— এমন একটি পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়, ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে একটি স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্থান।
শচীন দেব বর্মণের জন্মভিটাকে ঘিরে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের দাবি— এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, শুধু একটি বাড়ি সংরক্ষণ করলেই শচীন দেব বর্মণের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হবে না। তাঁর সংগীত, জীবন, ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, রেকর্ড, ছবি, চিঠিপত্র, স্বরলিপি, চলচ্চিত্রের তথ্য এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা গেলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংগীত গবেষণা ও প্রদর্শন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শচীন দেব বর্মণের ভিটেবাড়ি নিয়ে কাজের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কমিটি ভিটেবাড়ি পরিদর্শন এবং সেখানে সংগীত জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে।
সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তা ও সংগীত জাদুঘর বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক মো. সেরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শচীন দেব বর্মণের জন্মভিটা পরিদর্শন করে।
কুমিল্লার সংগীতশিল্পী ইকরাম মোস্তাফিজ পপলু বলেন, শচীন দেব বর্মণের কণ্ঠ ও সুরের মধ্য দিয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের লোকজ সংগীতের স্বাদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর জন্মভিটা সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর সংগীত ও জীবনকে তুলে ধরার পাশাপাশি বাড়িটিকে আরো কার্যকর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করা প্রয়োজন।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হোসেন মাহমুদের মতে, শচীন দেব বর্মণের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁর জন্মভিটা একটি মূল্যবান কেন্দ্র হতে পারে। এখানে দলিল, আলোকচিত্র, স্বরলিপি এবং অডিও-ভিডিও সংরক্ষণ করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা উপকৃত হবেন।
জাসাস কুমিল্লা মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সংগীতশিল্পী ইশতিয়াক আহমেদ পল্লব বলেন, শচীন দেব বর্মণ শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন; তিনি কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অন্যতম প্রতীক। তাই তাঁর জন্মভিটা সংরক্ষণ স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বের পাশাপাশি জাতীয় দায়িত্বও।
লাভ ফর বাংলাদেশ টুরিজম ক্লাবের সভাপতি মীর মফিজুল ইসলাম বলেন, কুমিল্লা জেলা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দিক থেকে সমৃদ্ধ। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি সংগীত ও সাহিত্যেও এ জেলার রয়েছে গৌরবময় অবদান। শচীন দেব বর্মণের জন্মভিটা সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুমিল্লার পর্যটন মানচিত্রে এটিকে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কুমিল্লার পর্যটন আকর্ষণের তালিকায় শচীন দেব বর্মণের বাড়ির উল্লেখও রয়েছে।
ঐতিহ্য কুমিল্লার পরিচালক গবেষক জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, কুমিল্লার চর্থার সেই বাড়িটিও তাই নীরব কোনো পুরোনো স্থাপনা হয়ে থাকতে পারে না। একদিন এখানে গড়ে উঠবে এমন একটি সংগীত জাদুঘর, যেখানে কুমিল্লার মাটিতে জন্ম নেওয়া এক কিংবদন্তির জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হবে নতুন প্রজন্ম। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের সংগীতপ্রেমীরা জানতে পারবেন, কীভাবে কুমিল্লার মাটি, গোমতীর স্রোত আর বাংলার লোকসুর একদিন জন্ম দিয়েছিল উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতস্রষ্টা শচীন দেব বর্মণকে।
গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, শচীন দেব বর্মণের জন্মভিটা সংরক্ষণের দাবিতে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিভিন্ন সময়ে বাড়িটির অংশবিশেষ উদ্ধার ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে মেলারও আয়োজন হয়ে আসছে। এখানে সংগীত জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা গেলে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচিতি আরো শক্তিশালী হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা কার্যালয়ের মাঠ কর্মকর্তা সজিব মিয়া বাসস-কে বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে অধিগ্রহণ করেছে এবং গত ২৫-২৬ ইংরেজি অর্থবছরে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এর সংস্কারকাজ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ বাড়ির নিরাপত্তায় সীমানা প্রচীরের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হলে এখানে মিউজিয়াম করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর শচীন দেব বর্মণের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট সুরের মৃত্যু হয়নি। তাঁর গান এখনো নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ফিরে আসে, তাঁর সুর নিয়ে গবেষণা হয়, তাঁর সংগীত নিয়ে আলোচনা হয়।