বাসস
  ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৭

রৌমারীতে গ্রিড সাবস্টেশন হলে অতিরিক্ত ৬,৩০০ টন ধান উৎপাদন সম্ভব

ছবি : বাসস

মো. মামুন ইসলাম

রংপুর, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : কুড়িগ্রামের রৌমারী ও আশপাশের এলাকায় একটি নতুন ১৩২/৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সরবরাহ গ্রিড সাবস্টেশন স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎচালিত লো-লিফট পাম্পগুলোর (এলএলপি) ভোল্টেজ সমস্যার সমাধান হবে। এর ফলে নির্বিঘ্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান খান বাসস’কে জানান, এলএলপি’র মাধ্যমে নদীর পানি উত্তোলন করে কৃষিজমিতে সাশ্রয়ী সেচ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় কৃষকরা বছরে ২২ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ৬,৩০০ টন ধান উৎপাদন করতে পারবেন।

তিনি জানান, কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ সেচযন্ত্র (অগভীর নলকূপ) ডিজেল দিয়ে চালানো হতো। এতে কৃষকদের সেচ খরচ অনেক বেশি পড়ত- প্রতি বিঘায় যা প্রায় ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাত।

উৎপাদন খরচ কমাতে, সেচ ব্যবস্থা আধুনিক ও টেকসই করতে এবং ধান উৎপাদনে গতি আনতে বিএমডিএ গত তিন বছরে এলাকায় ৩৬টি বিদ্যুৎচালিত এলএলপি স্থাপন করেছে। পাশাপাশি সেচের দক্ষতা বাড়ানো, পরিমিত পানি সরবরাহ এবং অপচয় রোধে ২৯ কিলোমিটার ১১ কেভি বিদ্যুৎ লাইন, দেড় কিলোমিটার ইউপিভিসি ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ও প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে।

এই পদক্ষেপের ফলে কৃষকদের সেচ খরচ কমেছে এবং কৃষি কাজ আরও লাভজনক হয়ে উঠেছে। তবে জামালপুর গ্রিড সাবস্টেশন থেকে রৌমারী উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। এই দূরপাল্লার বিতরণ লাইনে ক্রমাগত ভোল্টেজ কমে যাওয়ায় (ভোল্টেজ ড্রপ) এলএলপিগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। ফলে বিএমডিএ’র প্রায় ৫ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের পুরো সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না।

পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রৌমারী আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘রৌমারী থেকে জামালপুর গ্রিডের দূরত্ব ৯০ কিমি এবং রাজিবপুর থেকে দেওয়ানগঞ্জ গ্রিডের দূরত্ব ৭০ কিমি। দীর্ঘ বিতরণ লাইনের কারণে ভোল্টেজ কমে যাচ্ছে, যা বিএমডিএ’র ৩৬টি সেচ প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

তিনি আরও জানান, এই সমস্যা মেটাতে রৌমারী ও রাজিবপুর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে জামালপুরের বকশীগঞ্জে আরেকটি ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশন স্থাপনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে।

বিএমডিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রৌমারী ও রাজিবপুরের অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে ৬ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে বিএমডিএ’র বিদ্যুৎচালিত এলএলপি ব্যবহারে বিঘাপ্রতি খরচ হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা।

অর্থাৎ, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ খরচ গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা বা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিটি এলএলপি’র মাধ্যমে ৩৫ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যায়। ৩৬টি প্রকল্পের অধীনে মোট সেচ এলাকা ১,২৬০ হেক্টর।

ইঞ্জিনিয়ার খান জোর দিয়ে বলেন, ‘লো-ভোল্টেজ সমস্যা সমাধান করে ৩৬টি এলএলপি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো গেলে ১,২৬০ হেক্টর জমি থেকে বছরে ২২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ধান পাওয়া সম্ভব।’

স্থানীয় কৃষকরাও এই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থার সুবিধা নিতে উন্মুখ হয়ে আছেন।

রৌমারীর গয়টাপাড়া গ্রামের কৃষক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ভোল্টেজ না থাকায় আমরা নির্দিষ্ট ক্ষমতায় এলএলপি চালাতে পারছি না। এতে সময়মতো আমন ধানের জমিতে পানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’

শৌলমারি গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন জানান, ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানির চেয়ে এলএলপি দিয়ে নদী থেকে তোলা পানিতে ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ করা চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি সাশ্রয়ী ও লাভজনক।

ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রে যেন আর ফিরে যেতে না হয়, সে জন্য দ্রুত ভোল্টেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন এলাকার কৃষকরা।