বাসস
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫৪

ভোলা-ঢাকা রুটে ফেরি সার্ভিস, পণ্য পরিবহনে নতুন যুগের সূচনা

ছবি : বাসস

/আল-আমিন শাহরিয়ার/

ভোলা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ভোলা-ঢাকা নৌপথে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। 

গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে পরীক্ষামূলকভাবে ‘বেগম রোকেয়া’ ও ‘সুফিয়া কামাল’ নামে দুটি ফেরি চলাচলের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এ নৌযাত্রা শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিসি। 

ওইদিন ১৩টি পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে ভোলার ইলিশা নৌবন্দর ঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ফেরি ‘বেগম রোকেয়া’ এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে আসে ‘সুফিয়া কামাল’। ওইদিন থেকে শুরু হওয়া এ ফেরি সার্ভিসটি এরই মধ্যে নৌপথে চলাচলে সাড়া জাগিয়েছে। 

সরকারের এ নৌদপ্তরটি ভোলা-ঢাকা ফেরি চলাচল সার্ভিস এখন নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন-বিআইব্লিউটিসির ডিজিএম মুহাম্মদ তানভীর হোসেন। 

তিনি বাসসকে বলেন, এ বিষয়ে তার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পরীক্ষামূলক এই ফেরিযাত্রায় অংশ নেন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে ফেরিটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ভোলার ইলিশা নৌবন্দর ঘাট ছাড়ে। 

তিনি বলেন, পরীক্ষামূলক চলাচলের সময় ফেরির রুটের নাব্যতা, দূরত্ব ও যাতায়াতে প্রয়োজনীয় সময় এবং ঢাকায় কোন ঘাটে ফেরিট ভেড়ানো সুবিধাজনক হবে, এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে পরীক্ষামূলক চলাচলের পর এ বিষয়ে এখন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফেরিতে উঠা যানবাহনের সম্ভাব্য ভাড়াও নির্ধারণ করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।

বিআইডব্লিউটিসি ভোলা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. কাওসার আহমেদ বাসসকে বলেন, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভোলা-ঢাকা রুটে নিয়মিত ফেরি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এজন্য নতুন ফেরি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে ঘাট পরিদর্শনসহ রুটের দূরত্ব ও সময় নির্ধারণের কাজও করা হয়েছে।

গত রোববার পরীক্ষামূলক ফেরি চলাচল শেষে রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত বিআইডব্লিউটিসির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোলার ইলিশা থেকে ঢাকার কাঁচপুর রুটে ফেরি চলাচলের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়। 

‘বেগম রোকেয়া’ নামক ফেরির ইনচার্জ মাস্টার মো. মোসাহেদুল ইসলাম বাসসকে বলেন, এ রুটে ফেরি চলাচলে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে।

গত ২৭ আগস্ট ভোলার ইলিশা ফেরিঘাট থেকে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়ে এখন নিয়মিত এই রুটে ‘বেগম রোকেয়া’ ও ‘সুফিয়া কামাল’ নামে দুটি ফেরি চলাচল করছে।

ফেরি চলাচলের সম্ভাব্যতা ও যাচাই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, বিআইডব্লিউটিসি’র সহকারী মহাব্যবস্থাপক খান মো. জাফর, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মাওলা, উপ-পরিচালক মাসুদুল হক এবং ব্যবস্থাপক মো. আল-আমিন।

নৌদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে ফেরি চলাচল করলেও এর গন্তব্য ছিল লক্ষ্মীপুর। এবারই প্রথম এ ঘাট থেকে সরাসরি ঢাকার উদ্দেশ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফেরির যাত্রা শুরু হলো। ফলে দীর্ঘদিনের ভোলা-ঢাকা সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালুর দাবি বাস্তবায়ন হওয়ায় খুশি এলাকাবাসী ও স্থানীয় পরিবহন চালকরা। 

এ বিষয়ে ভোলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিকরা বলেন, এতোদিন ইলিশা থেকে ফেরি লক্ষ্মীপুরে গেলেও সরাসরি ঢাকার পথে ফেরি চলাচল ছিল উপকূলীয় জনপদ ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এ রুটে ফেরি চলাচলের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে ভোলাবাসীর। পাশাপাশি ভোলার কৃষিপণ্য, মাছ ও ইলিশসহ বিভিন্ন পণ্য রাজধানীর বাজারে পাঠাতে সরাসরি ফেরি সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে রাজধানী থেকে ভোলায় পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবহন ব্যবস্থা আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য হবে বলে আশা করছেন তারা।

এদিকে, ভোলা-ঢাকা নৌপথে প্রায় তিন বছর আগে ব্যক্তি মালিকানায় পণ্য পরিবহন ও যাত্রীবাহী বাহন আনা-নেওয়ার লক্ষ্যে ‘কার্নিভাল ক্রুুজ’ এবং ‘কার্র্নিভাল ওয়েভ’ নামে দুটি ফেরি চালু হয়। ওই ফেরিতে বর্তমানে নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিবহন আসা-যাওয়া করলেও বাকিদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফলে সরকারি ফেরি চালুর খবরে পরিবহন মালিকরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশা, নিয়মিত ফেরি সার্ভিস চালু হলে ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহন আরও সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হবে। 

পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন ফেরিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিবহন আসা যাওয়া করায় ফেরির সিরিয়াল পেতে ২ থেকে ৩ দিন সময় লাগে। সরকারি এ ফেরি চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই ভোগান্তি লাঘব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নৌদপ্তর সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, এর আগে দীর্ঘ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে ভোলার ইলিশা-লক্ষ্মীপুর নৌপথে প্রথম ফেরি সার্ভিস চালু হয়। বর্তমানে ওই রুটে পাঁচটি ফেরি চলাচল করছে। সেই ইলিশা ঘাট থেকেই এবার ফেরির নতুন গন্তব্য শুরু হলো রাজধানী ঢাকার কাঁচপুর ঘাটে।

‘ভোলা স্বার্থ রক্ষা’ উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. শওকাত হোসেন বলেন, ভোলা-ঢাকা রুটে ফেরি চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারি উদ্যোগে এ ফেরি সার্ভিস চালু করার সিদ্ধান্তকে তিনি উপকূলীয় এলাকার সাথে রাজধানীর নৌ যোগাযোগে নতুনযুগের সূচনা বলে অভিহিত করেন। 

ভোলার জেলা প্রশাসক মো.শামীম রহমান বাসসকে বলেন, একদিকে আগামীর সড়কপথ যোগাযোগ, অন্যদিকে নৌপথে ফেরি সার্ভিস এবং প্রতিদিনের লঞ্চ সার্ভিস, সব মিলিয়ে আগামীর ভোলা ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় জেলাগুলোর সাথে দেশের সব অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়নের নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটবে।

এদিকে ভোলা-ঢাকা নৌপথে প্রায় তিন বছর আগে ব্যক্তি মালিকানায় যাত্রীবাহী ফেরি ‘কার্নিভাল ক্রুজ’ চালু হয়। 

ভোলা স্বার্থ রক্ষা কমিটির নেতাদের অভিযোগ, ওই ফেরিতে বর্তমানে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে গ্যাসের সিলিন্ডার বহন করা হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন ‘কার্নিভাল ক্রুজে’ প্রায় ১২টি এলএনজি গ্যাসবাহী গাড়ি পারাপার করা হয়। তবে বিআইডব্লিউটিসির ‘বেগম রোকেয়া’ ফেরিতে একসঙ্গে কমপক্ষে ২৫টি গাড়ি পরিবহনের সুযোগ থাকবে।

সরকারি ফেরি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর খবরে পরিবহন মালিক সমিতির নেতারাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশা, নিয়মিত ফেরি সার্ভিস চালু হলে ভোলা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহন আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য হবে।

ভোলা-ঢাকা রুটে পরীক্ষামূলক এই ফেরি চলাচল সফল হলে দ্বীপজেলা ভোলার সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নৌপরিবহন এবং নৌ বিষেজ্ঞরা মনে করছেন, ভোলা-ঢাকা রুটে নতুন সরকারি ফেরি সার্ভিসের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহনে নতুন যুগের সূচনা করলো উপকূলীয় নৌপথ।

উল্লেখ্য, উপকূলীয় জেলা ভোলা ও তৎসংলগ্ন জেলাগুলো থেকে ভোলার ইলিশা-লক্ষ্মীপুর নৌ রুটে ফেরি চলাচলের মাধ্যমে প্রতিদিন পণ্য আনা-নেওয়া হয়ে থাকে। এবার ঢাকার সাথে ভোলার সরকারি ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় সেই পণ্য নিয়ে রাজধানীতে যেতে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘ বিড়ম্বনার অবসান ঘটলো বলে মনে করছেন ভোলাবাসী।