বাসস
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৩

কাজী নজরুলের গাজীপুর সফর স্মরণীয় করতে উদ্যোগ নেয়ার দাবি স্থানীয়দের

সেলিনা শিউলী ও মুহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের এক উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে (সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এসেম্বলী) স্বরাজ পার্টির হয়ে গণসংযোগে গাজীপুরের জয়দেবপুরে এসেছিলেন ।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ সমন্বয়ে গঠিত বিশাল আসনের মুসলিম সংরক্ষিত পদে প্রার্থী হয়েছিলেন জাতীয় কবি। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত নজরুল পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করেন। এই সফরের এক পর্যায়ে তিনি ট্রেনে চেপে রাজবাড়ির পরগনাখ্যাত জয়দেবপুর ও তৎকালীন গাজীপুর অঞ্চলে আসেন।

এক শতাব্দী আগে, শরৎ-হেমন্ত ঋতুতে সেই রাজনৈতিক ভ্রমণের ধকলের মধ্যেও কবির সংবেদনশীল হৃদয়ে জেগে উঠেছিল প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য-বন্দনা।

আর সেই সৌন্দর্যচেতনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নান্দনিক রূপকল্পসমৃদ্ধ কবিতা ‘চাঁদনী রাতে’, যার আদি নাম ছিল ‘জয়দেবপুরের পথে’।

কাজী নজরুলের এই ঐতিহাসিক সফর ও অবস্থানের সময়কাল নিয়ে বাসসের সঙ্গে কথা বলেন গাজীপুরের ভাষা শহীদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক।

তিনি জানান, কাজী নজরুল 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে ট্রেনে চড়ে রাতের দিকে আসার পথে লিখেছিলেন। নির্বাচনকালে কবি ঢাকায় ৫২, বেচারাম দেউড়ীতে অবস্থান করতেন। প্রচার কাজে নভেম্বর মাসের ১ম থেকে ২১ তারিখের মধ্যে কোনো একদিন তিনি রাতের ট্রেনে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহ যান। তিনি আরো জানান, যতটুকু জানা যায়, নজরুল গাজীপুরে এসে তৎকালীন ভাওয়াল রাজার ডাকবাংলোতে রাত যাপন করেছিলেন এবং পরদিন নির্বাচনী গণসংযোগ শেষ করে গন্তব্যে চলে যান। এই সফরে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন কবি আবদুল কাদির।

গাজীপুরের ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, নির্বাচনী বাস্তবতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত কবির সৌন্দর্যবোধকে প্রাণহীন করতে পারেনি। সেই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নজরুলের সফরসঙ্গী কবি আবদুল কাদির লিখেছিলেন-‘জ্যোৎস্না রাত্রি, সমস্ত আকাশ গেছে কৌমুদীতে ভরে, সারা দিগন্তদেশ যেন তারি আনন্দে উদ্বেল। কবি জয়দেবপুর চলেছেন নির্বাচনের তদবির করতে, কিন্তু তাঁর মনের অঙ্গন থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে বাস্তব সংসারের সকল দ্বন্দ্ব-দ্বেষ সংক্ষোভ সংঘর্ষ, শুধু বাজছে দিগন্তপ্লাবী সৌন্দর্যের একটানা সুর-মূর্ছনা। সেই সৌন্দর্যের সূত্রে তিনি গেঁথে চললেন শ্লোকের পর শ্লোক। রচিত হলো একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা: জয়দেবপুরের পথে।’

গাজীপুর মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. ফরিদ আহমেদ তাঁর ‘গাজীপুর জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে তাঁর বিখ্যাত, 'সিন্ধু-হিন্দোল' কাব্যগ্রন্থে সংকলিত এই অমর কবিতাটি একটি অনন্য নান্দনিক রূপকল্পের নিদর্শন। ৩৬ চরণের এই কবিতার প্রতি লাইনে সাত-আটটি শব্দের অপূর্ব চয়ন জয়দেবপুরের তৎকালীন শান্ত, স্নিগ্ধ ও রূপময় পরিবেশকেই তুলে ধরে।

গ্রন্থটির গবেষণা অনুযায়ী, কবিতাটি মোহাম্মদ কাশেম সম্পাদিত 'অভিযান' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ছাপার জন্যে দেয়া হয়। পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে সম্পাদক কবিতা চাইলে নজরুল ‘জয়দেবপুরের পথে’ শিরোনামেই এটি পাঠান। পরবর্তীসময়ে 'অভিযান' বন্ধ হয়ে গেলে কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত 'জয়তি' পত্রিকায় কবিতাটি নতুন নাম ‘চাঁদনী রাতে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এরপর এটি কবির বিখ্যাত 'সিন্ধু-হিন্দোল' কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়।

কবিতাটিতে কবি জয়দেবপুরের রাতের আকাশ, প্রকৃতি ও মেঘ-জোছনার খেলাকে যেভাবে অলঙ্কৃত করেছেন, তা এক অতুলনীয় কাব্যিক সুষমায় মণ্ডিত। কবি লিখেছেন:

‘কোদালে মেঘের মউজ উঠেছে গগনের নীল গাঙে,

হাবুডুবু খায় তারা-বুদ্বুদ্, জোছনা সোনায় রাঙে।’

রাতের কুয়াশা ও দিকচক্রের বৃক্ষরাজি দেখে নজরুলের কল্পনা পৌঁছে যায় বহুদূরে। কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে প্রকৃতির মোহনীয় রূপ:

‘দিক্চক্রের ছায়া-ঘন ঐ সবুজ তরুর সারি,

নীহার নেটের কুয়াশা-মশারি ও কি বর্ডার তারই?’

এমনকি বিরহ ও আবেগের নিখুঁত ছোঁয়ায় তিনি রূপক তৈরি করে লেখেন:

‘আবেগে সোহাগে আকাশ-প্রিয়ার চিবুক বাহিয়া ও কি

শিশিরের রূপে ঘর্মবিন্দু ঝ'রে ঝ'রে পড়ে সখি...’

একই সফরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গাজীপুরের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুবোধ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমরা প্রামাণ্য তথ্যে জানতে পেরেছি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণার কাজেই জয়দেবপুরে এসেছিলেন। সফরটি গাজীপুরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়।’

তিনি বলেন, জাতীয় কবির এই সফর স্মরণীয় হলেও গাজীপুরে সরকারি উদ্যোগে নজরুল স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অনুযোগ রয়েছে।

গাজীপুরে মরহুম নজরুল ইসলাম বাদামী প্রতিষ্ঠিত ‘বিদ্রোহী কবি স্মৃতি সংসদ’-এর বর্তমান চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বিপ্লব বলেন, ‘গাজীপুরে সরকারি উদ্যোগে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। জাতীয় কবির এই ঐতিহাসিক সফরের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে গাজীপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আকুল আহ্বান জানাচ্ছি।’

১৯২৬ সালের সেই জোছনাধোয়া রাতে জয়দেবপুরের পথে ট্রেনের কামরায় বসে কবি নজরুল যে সাহিত্যসৃষ্টির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা এক শতাব্দী পরেও অমলিন। নির্বাচনী জটিলতার মধ্যেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কালজয়ী পংক্তিমালা উপহার দেওয়ার এই স্মৃতি গাজীপুরবাসীর জন্য এক পরম গর্বের বিষয়।

ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, ভাওয়াল রাজার ডাকবাংলো চিহ্নিতকরণ, স্মরণফলক নির্মাণ এবং 'জয়দেবপুরের পথে' কবিতাটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতীয় কবির এই অনন্য স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করা সম্ভব।