বাসস
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:২৪

শত বাধা ও কঠিন পথ পেরিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ছবি

দিদারুল আলম

ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লড়াই, সংগ্রাম, অর্জন ও রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে দলটি। গত ৪৮ বছর ধরে বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা ও কঠিন সময় পেরিয়ে বিএনপি আজ দেশের জনগণের আস্থায় এক অদম্য এবং অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শত বাধা ও কঠিন পথ পেরিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য ইতিহাস গড়েছে বিএনপি।

২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে বিএনপিকে। ২০০৭ সালের বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে দলটির ওপর দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হয়। ওই সময় দল ভাঙার চেষ্টা থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ, সব মিলিয়ে চরম সংকটে পড়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজপথে চরম দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের। এই সময়ে দলের কয়েক লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার ‘মিথ্যা’ ও ‘গায়েবি’ মামলা দেওয়া হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন দমাতে গুম, খুন আর নির্যাতনের খড়্গ নেমে এসেছিল তৃণমূল পর্যন্ত। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে দলকে টিকিয়ে রাখাই ছিল নেতৃত্বের বড় সার্থকতা।

ছবি: সংগৃহীত

২০০৭ সালের বিতর্কিত এক-এগারোর পর গত দুই দশকের প্রতীক্ষা, আন্দোলন আর কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে জনগণের বিপুল রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল রায়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে পঞ্চম বারের মত সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করে বিএনপি।

ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে নানা কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।

বিতর্কিত এক-এগারোর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একদলীয় নির্বাচন (বিনাভোটে আওয়ামী জোটের ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত), ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট জালিয়াতি তথা রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে জন রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন না হওয়ায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।

এর আগে সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির এবারের প্রত্যাবর্তন সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক পুনরুত্থান’।

দলটির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বিতর্কিত এক-এগারোর পর দুই দশক ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষার। বিতর্কিত মামলায় তাঁকে কারারুদ্ধ করার পর দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ কারাবাসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি আপসহীন থেকেছেন। এ সময়ে দলের হাল ধরেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

এর আগে থেকে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দল সুসংগঠিত হয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের কর্মসূচি পালিত হয়।

২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের পর চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। পরে বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একের পর এক সাজানো ও মিথ্যা মামলায় তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হয়। আদালতকে ব্যবহার করে গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার বন্ধ রাখা হয়।

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে এবং পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ছবি: সংগৃহীত

প্রায় ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে রাজসিক প্রত্যাবর্তন করেন তারেক রহমান। প্রিয় নেতাকে বরণ করতে ওইদিন রাজধানীর পূর্বাচলে লাখ লাখ নেতাকর্মী, সমর্থক আর সাধারণ মানুষ জড়ো হন। তাদের ভালোবাসায় একদিকে তারেক রহমান যেমন সিক্ত হলেন, অন্যদিকে তিনিও দেশের মানুষকে শোনালেন তাঁর স্বপ্নের কথা, তাঁর পরিকল্পনার কথা।

দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটির বড় কোনো ভাঙন না হওয়া ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যখন নির্বাসিত জীবনে এবং বেগম খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে, তখনো তৃণমূলের ঐক্য অটুট ছিল।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ২০২৬ সাল- বিএনপি ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, বিরোধী দলে থেকেছে, আন্দোলন করেছে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় দেখেছে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে এবং কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠন হিসেবে টিকে থেকে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

বিএনপির যাত্রা

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে বাংলাদেশ বিনির্মাণে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৭৯ সালে প্রথম নির্বাচনী সাফল্য

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে নবগঠিত দলটি জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

১৯৮১-১৯৮২ সালের কঠিন সময়

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে চলে যায়। শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক সংগ্রাম।

১৯৮৩-১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

আশির দশকজুড়ে বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনকে সংগঠিত করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।

তীব্র গণআন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি হয়। বিএনপির জন্য এটি ছিল দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন।

ছবি: সংগৃহীত

১৯৯১ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পালাবদল

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয়। একই বছরের ১২ জুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬ আসন লাভ করে ইতিহাসের বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি।

২০০১ সালে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় বিজয় অর্জন করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০১-২০০৬ সময়কালে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে।

ছবি: সংগৃহীত

২০০৭-২০০৮ সালে জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট

২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয় বিএনপি। ওই সময় গ্রেফতার হন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির ওই সময়ের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, ছোট পুত্র আরাফাত রহমান কোকো, দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তখন বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি লাভ করেন। কারা হেফাজতে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে মুক্তির পর চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ পাঠানো হয়। নির্বাসিত জীবনে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

নতুন সংকট ও লড়াই-সংগ্রাম

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। যদিও ওই নির্বাচনটি নানা কারণে ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তথাপি ফলাফল মেনে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ২০১৩ সালে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলায় এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তখন বিএনপির অগণিত নেতাকর্মী হামলা-মামলা শিকার হয়ে কারাবরণ ও গুমসহ অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন।

২০১৬-২০১৭ সালে বিএনপি দলকে পুনর্গঠন করে। জেলা, মহানগর ও তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে সক্রিয় করা হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট সুযোগ পাননি। দলটির অনেক প্রার্থী হামলা ও গ্রেফতারের শিকার হন। নির্বাচনের আগের দিন রাতেই সারা দেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। তাই ওই নির্বাচন রাতের ভোটের নির্বাচন হিসাবে স্বীকৃতি পায়। নির্বাচনের পর বিএনপি সংসদে সীমিত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধী রাজনীতিতে নতুনভাবে প্রবেশ করে।

২০১৯-২০২১ সালের কঠিন রাজনৈতিক সময়

এই সময়ে বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যায়। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ও চিকিৎসা বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে।

২০২২-২০২৩ সালে রাজপথে নতুন জাগরণ

২০২২ সাল থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ, গণমিছিল, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, সরকারের পদত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়।

২০২৩ সালে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ওই সময় আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নানা রকম নির্যাতন-নিপীড়ন ও বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করলেও দিনে দিনে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। দলের কর্মী-সমর্থকরাও সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করে দলীয় কর্মসূচি সফল করেন।

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালে রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচন বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে। আওয়ামী লীগ দলীয় লোকদের নিয়েই ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।ফলে নির্বাচনটি আমি-ডামির নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান

সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনে গোটা দেশের ছাত্রসমাজের সাথে বিএনপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও অনন্য ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। গুলিতে নিহত হন চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম। এরপর আন্দোলন সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।

অপরদিকে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারও পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শহীদ ও ২৩ সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অবশেষে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও নেতৃত্বে থাকা নেতৃবৃন্দকে নির্বাসিত জীবন থেকে সাহস, সমর্থন ও দিকনির্দেশনা দেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই সময় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ আন্দোলনের সমর্থন দেওয়া রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দলটি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠনের কাজকে আরও গুরুত্ব দেয়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির সামনে আসে নতুন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি, দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিকল্পনা সামনে আসে। দলের জন্য এটি ছিল আন্দোলন থেকে সম্ভাব্য রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতিতে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।

২০২৬ সালের ঐতিহাসিক পুনরুত্থানের অধ্যায়

২০২৬ সালে এসে বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন বাঁকে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, নেতাকর্মীদের ত্যাগ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বিএনপি আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি দলের ক্ষমতায় আসা বা নির্বাচনী সাফল্যের প্রশ্ন নয়; এটি ৪৮ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।

৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক অর্জন

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি।

দলটি পাঁচবার জাতীয় নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেছে। নারী নেতৃত্বের বিকাশে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকেও বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জনগণের পাশে থেকেছে বিএনপি।

দলের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলীয় অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক শক্তি জোরদার ছিল।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে ২০২৬ সালে ৪৮ বছরে পদার্পণ- এটি বিএনপির জন্য শুধু একটি সময়ের হিসাব নয়; এটি বহু উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরীক্ষার ইতিহাস।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজপথ ও রাষ্ট্রক্ষমতার দুই ভিন্ন বাস্তবতা দেখেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনটি টিকে থেকেছে। আজকের পুনরুত্থান তাই হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়-এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার ধারাবাহিকতা।