বাসস
  ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪৮
আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২২

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে : জেট্রো

ঢাকা, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে জাপানি কোম্পানিগুলো। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা।

সম্প্রতি বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতাওকা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা জাপানি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল।

তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জেট্রোর ২০২৫ অর্থবছরের ‘বিদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে কাতাওকা বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ ‘অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে’ বিনিয়োগের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি জানান।

জেট্রো কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা ও জেট্রো লোগো। কোলাজ

কাতাওকা বলেন, ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কোম্পানিগুলোকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে সহজ করে দেয়।’

সম্প্রতি টোকিওতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

কাতাওকা বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও ব্যবসায়িক সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করছে। এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ বেড়ে যাবেÑএমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে করব্যবস্থা ও শুল্ক ছাড়করণ, লাইসেন্স ও অনুমতি প্রদান এবং আইন ও বিধিবিধানের স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ ও জাপানের ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে কাতাওকা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে হবে।

কাতাওকা বলেন, ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জাপানে বিনিয়োগকেও স্বাগত জানাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে শুধু একমুখী বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই যথেষ্ট নয়। উভয় দেশের কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়াতে হবে এবং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করবে।’

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের প্রতি, বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান কাতাওকা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৬ শতাংশের অবদান ঢাকার। অন্যদিকে রাজধানীতে মাথাপিছু আয় ৫ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি।

বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় আয় বাড়তে থাকায় রাজধানী ক্রমেই একটি আকর্ষণীয় ভোক্তা বাজারে পরিণত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কাতাওকা বলেন, ঢাকায় উন্নত মান ও সেবার ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। এটি মানসম্মত পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্কহার থাকায় আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

কাতাওকা বলেন, ‘এর ফলে কিছু জাপানি কোম্পানি শুধু রপ্তানির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের কথা ভাবছে না, বরং স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে পণ্য সংগ্রহের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের বিষয়টি বিবেচনা করছে।’

দেশীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনার সমন্বয় আগামী বছরগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন কাতাওকা।

তবে বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও পুনরায় উল্লেখ করেন তিনি।