বাসস
  ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৬
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫৩

সাতক্ষীরায় ঘানিতে সরিষার তেল উৎপাদনে সাড়া ফেলেছেন উদ্যোক্তা মোশারফ 

ছবি : বাসস

সাতক্ষীরা, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বাজারে যখন ভেজাল তেলের ভিড়ে মানুষ অতিষ্ঠ, তখন সাতক্ষীরার বিসিক শিল্প নগরীতে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছেন সফল উদ্যোক্তা মোশাররফ হোসেন। এক সময় মধুর ব্যবসা করলেও এখন ১২টি তেঁতুল কাঠের ঘানি ও আধুনিক ফিল্টার মেশিনে মাসে প্রায় ২০ টন সরিষার তেল উৎপাদন করছেন তিনি। যা স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণ ও অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সরিষা থেকে উৎপাদিত এ তেল এখন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন (৪৫) সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পার্শ্বেমারী গ্রামের মো. মজিদ গাজী ও করিমন নেছা দম্পতির ছেলে।

জানা যায়, সাতক্ষীরায় কাঠের ঘানির খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন এক সম্ভাবনাময় শিল্প। তেঁতুল বা অন্যান্য কাঠের ঘানিতে ভাঙানো তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে জেলায়। ভোজ্য তেলের বাজারে বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা নিয়ে সাতক্ষীরার বিসিক শিল্প এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক সরিষার তেলের মিল ‘সুন্দরবন ওয়েল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। উদ্যোক্তা মোশাররফ হোসেনের হাত ধরে এখানে চলছে তেঁতুল কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই। প্রতিদিন ৫ টন সরিষা মাড়াই করে মাসে উৎপাদিত হচ্ছে ২০ টনেরও বেশি তেল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪২ লাখ টাকা। তেলের পাশাপাশি উৎপাদিত খৈল ব্যবহার হচ্ছে স্থানীয় মৎস্য ঘেরগুলোতে। জেলায় তার মতো অনেকেই এখন কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল উৎপাদন করছেন। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে।

মিলটির ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ বাসসকে জানান, আমরা প্রাথমিকভাবে চাষীদের কাছ থেকে সরিষা সংগ্রহ করি। এরপর ওই সরিষা ভাল করে শুকিয়ে কাঠের ঘানিতে দেয়া হয়। ঘানি থেকে ৮০-৮৫ পার্সেন্ট তেল বের হওয়ার পর এবার বাকি যেটা থাকে, সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার স্লাপার মেশিনে দেয়া হয়। এরপর সেখান থেকে আরো ১০-১৫ পার্সেন্ট তেল বের হয়। পরে তেলগুলো অত্যাধুনিক ফিল্টার মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধিত করে ওই তেল বোতলজাত করে খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়। 

তিনি বলেন, প্রতিদিন আমাদের মিল থেকে ২০-২৫ মণ সরিষা মাড়াই করা হয়। আর এ থেকে ১ হাজার থেকে ১২’শ মণ তেল উৎপাদন হয়। এছাড়া এ থেকে প্রতিদিন ২০-২৫ বস্তা খৈল হয়। এই খৈলগুলো আমরা স্থানীয় মৎস্য ও গরুর খামারে বিক্রি করে থাকি। 

তিনি অরো বলেন, আমাদের এ মিলের বিশেষত্ব হলো এখানে শতভাগ দেশি সরিষা ব্যবহার করা হয়। কোল্ড প্রেস ও আধুনিক ফিল্টার প্রযুক্তির সমন্বয়ে উৎপাদিত এ তেলের মান নিয়ে সন্তুষ্ট স্থানীয় ক্রেতারাও।

কর্মচারী আশিকুজ্জামান জানান, এই মিলে আমরা ১০ জন শ্রমিক কাজ করি। এখান থেকে আমাদের যে বেতন দেয়, তা নিয়ে আমরা আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই আছি। দুই শিফ্টে ৬ ঘন্টা করে আমরা মিলে মিশে এখানে কাজ করি।
কারখানা দেখতে আসা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মোশারফ ভাইয়ের ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলটা দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে। আমি তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান করতে চাই।

‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলের স্বত্বাধিকারী মো. মোশাররফ হোসেন বাসসকে বলেন, বিসিক শিল্পনগরীতে আমার একটি মধু প্রসেসিং সেন্টার রয়েছে। তার পাশাপাশি সাতক্ষীরায় ব্যাপক হারে সরিষার চাষ হওয়ায় আমি এ সরিষা দিয়ে ভেজাল মুক্ত সরিষার তেল সরবরাহ করার জন্য ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিল নামে একটি তেলের মিল প্রতিষ্ঠা করি। প্রতিদিন এখানে ৫ টন সরিষা মাড়াই হচ্ছে। যা থেকে ২ থেকে ৩ টন তেল উৎপাদন হচ্ছে। এই তেল সারা দেশে পাইকারি দামে বাজারজাত করা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, আমার এ মিলে বর্তমানে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া অসংখ্য ছোট ছোট উদ্যোক্তা আমার কাছ থেকে তেল নিয়ে অনলাইনে খুচরা তেল বাজারজাত করছেন। তিনি এসময় বিসিক শিল্প নগরীর সকল কলকারখানা চালু রাখতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি জানান সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের প্রতি।

সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্পটি জাতীয় পর্যায়ে আরো বড় অবস্থান তৈরি করবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

সাতক্ষীরার বিনেরপোতা বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে বলেন, শিল্পনগরী সাতক্ষীরা ১৫ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। এর মধ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা খুবই উদ্যোমী। তার মধ্যে ‘সুন্দরবন অয়েল’ মিলের স্বাত্বাধিকারী মোশারফ অন্যতম। তিনি মধু প্রসেসিং কারখানা থেকে এবার কাঠের ঘানি দিয়ে সরিষার তেল উৎপাদন করছেন। যা অল্প দিনেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী তিনি বর্তমানে তেল সরবারহ করতে পারছেন না। বিসিক থেকে তাকে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তার মতো উদ্যোক্তাদের এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তার মতে, এমন উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেই স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।