বাসস
  ২০ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৯

পরিবেশ দূষণে অসহনীয় দুর্ভোগে চট্টগ্রামবাসী, বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ

ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম, ২০ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বায়ু ও শব্দদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী।

ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং উন্মুক্ত স্থানের ধূলার কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণে বছরের পর বছর ধরে নগরবাসীর মধ্যে ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ বাড়ছে।

একদিকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন, আবাসিক এলাকার আশপাশে অবস্থিত ওয়েল্ডিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ থেকে সৃষ্ট শব্দদূষণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন অভিজাত আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ জেনারেটরের শব্দও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এসব কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দদূষণের মাত্রা প্রায় ২০০ ডেসিবেলে পৌঁছেছে, যেখানে সহনীয় মাত্রা ৬০ ডেসিবেল।

পরিবেশবিদরা বলেছেন, হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ সহনীয় হার ৬৫ শতাংশ হার্টিজ স্মোক ইউনিটের বিপরীতে ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ধুলাবালির দূষণও ৫০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হয়েছে। অথচ সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেটস ম্যাটারের ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ২০০ মাইক্রোগ্রাম বলে বিবেচিত হয়।

অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট মোড়, জিইসি মোড়, নিউমার্কেট, আগ্রাবাদ ও আন্দরকিল্লাসহ কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি।

ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং উন্মুক্ত স্থানের ধূলা একত্রিত হয়ে নগরীর বায়ুর মান ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটাচ্ছে।

নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা শিক্ষার্থী নোহা আক্তার বলেন, ‘পাশের কক্ষ থেকে আমার মা জোরে ডাকলেও আমি শুনতে পাই না। কারণ পাশের আবাসিক ফ্ল্যাট ও ওয়েল্ডিং কারখানার জেনারেটর থেকে প্রচণ্ড শব্দ হয়।’

চকবাজার এলাকার শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আমি সাধারণত রাতে পড়াশোনা করি। কিন্তু অতিরিক্ত শব্দের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঘুমানোও যাচ্ছে না। ভারী যানবাহনের শব্দ শুনে আমার সন্তানরা প্রায়ই ভয় পেয়ে ঘুম থেকে উঠে কান্না করে।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুস সাত্তার বলেন, দীর্ঘসময় ধরে শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েই পুরোপুরি শ্রবণশক্তি হারাতে পারেন।

তিনি জানান, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ধরনের পরিবেশগত অবনতি অব্যাহত থাকলে নগরবাসীর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ওয়েল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও লেদ মেশিন, লোহার কারখানা এবং জেনারেটর আবাসিক এলাকা থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে স্থাপন করতে হবে।

বিদ্যুৎ জেনারেটরও ভূগর্ভে স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কারখানা ও ওয়েল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক এবং আবাসিক ভবনের ডেভেলপাররা এ পরিস্থিতি নিয়ে করা অভিযোগের প্রতি কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় ৩২টিরও বেশি হালকা ও ভারী যানবাহন ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলাচল করছে। এসব যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, তারা প্রতি ছয় মাস পরপর এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহনের তথ্য নগরী ও জেলার ট্রাফিক বিভাগে পাঠায়, যাতে যানবাহনগুলো পরীক্ষা করে কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকদের নিয়মিত নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। তাদের যানবাহন সংস্কার, ফিটনেস সনদ নবায়ন এবং সড়ক কর পরিশোধের জন্যও তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

বিআরটিএ কর্মকর্তারা দাবি করেন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ এবং মহানগর ও জেলা পুলিশের সহায়তায় তারা ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। তবে অজ্ঞাত কারণে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক/জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন শুধু বায়ু ও শব্দদূষণই সৃষ্টি করে না, এগুলো যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার জন্যও দায়ী।

তিনি যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন বাসসকে বলেন, তারা বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৮ সাল থেকে কালো ধোঁয়া নির্গমনের দায়ে বিপুলসংখ্যক ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে জরিমানা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। শব্দদূষণ নিয়ে কেউ অভিযোগ করলে কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব আইনগত ব্যবস্থা নেবে।