শিরোনাম

॥ ওমর ফারুক ॥
রাজশাহী, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঐতিহ্য সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের অধিক ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিছে। চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় রাজশাহী জেলায় এবার শুধু অধিক ফলনই নয়, বাজারে পাটের বর্তমান ভালো দাম এবং রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের মনে আশার আলো জেগেছে। এ বছর জেলার উৎপাদিত পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলাতেই কমবেশি পাটের আবাদ হয়েছে। জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এ বিশাল পরিমাণ জমি থেকে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে গত বছর (২০২৫ সালে) ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪৮হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতবারের তুলনায় এবার যেমন আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে, তেমনি উৎপাদন ও আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি মৌসুমে পাট কাটা, জাগ দেয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে জেলার মোট আবাদি জমির ৮২ শতাংশ পাট কাটা সম্পন্ন হয়েছে। আর এই কর্তনকৃত জমি থেকেই উৎপাদিত হয়েছে ৪৮ হাজার ২শ’ মেট্রিক টন পাট। বাকি ১৮ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হলে মোট উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে সহজেই ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর পাটের বাজারদর অত্যন্ত সন্তোষজনক। বর্তমানে স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রতি মণ (৪০ কেজি) পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার ৩শ’ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার মোট প্রত্যাশিত উৎপাদন থেকে স্থানীয় বাজারে পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৮ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা আয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ রেকর্ড পরিমাণ অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচল করবে এক বিশাল গতিশীলতা।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার পাটচাষি মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গতবার পাটের দাম কিছুটা কম থাকায় আমাদের মনে হতাশা ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবার ফলনও ভালো হয়েছে আর বাজারে দামও পাচ্ছি খুব ভালো। প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারছি। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এ দাম পাওয়ায় ভালো লাভ থাকছে।
মোহনপুর উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাট জাগ দেয়া ও ধোয়া নিয়ে তেমন কোনো বিপাকে পড়তে হয়নি। বর্তমান বাজারে পাটের যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। এ বছর পরিবারের সব খরচ মিটিয়ে বেশ কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হবে।’ মৌসুমের প্রথম দিকে বৃষ্টি না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। পরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমরা বেশ উপকৃত হয়েছি।
রাজশাহীতে উৎপাদিত এ সোনালি আঁশ শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটাতেই সীমিত নয়। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখানকার পাট দেশের বিভিন্ন বড় বড় পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া এসব পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের পর বিভিন্ন পাটপণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি সহায়তা, সময়মতো উন্নত বীজ ও সারের সহজলভ্যতা এবং বর্তমান বাজারদর এভাবেই বজায় থাকলে আগামী দিনে রাজশাহী অঞ্চলে পাটের আবাদ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বাসস’কে বলেন, রাজশাহী জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এ জমি থেকে ৪৯ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে গত বছর ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪৮হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। এখন ৪৩০০ টাকা দরে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে। সে অনুযায়ী এবছর পাট বিক্রি করে ৫৪৯ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ পাট স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাটজাত পণ্য তৈরিকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।