বাসস
  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪০

দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলায় ধংসের পথে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী ‘ভাসানী হল’

ছবি : বাসস

টাঙ্গাইল, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : জেলা শহরের এক সময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী ‘ভাসানী হল’ বর্তমানে ধুলোবালি, ভাঙাচোরা দেয়াল আর তালাবদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতায় ঢাকা। দীর্ঘদিনের চরম অযত্ন, অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে অর্ধশত বছরের পুরোনো টাঙ্গাইল ‘ভাসানী হল’ মিলনায়তনটি এখন পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ‘ভাসানী হলটি’ সংস্কার বা পুননির্মাণের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সুধী সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মীগণ। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরের এক সময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী ‘ভাসানী হলে’র সামনের বারান্দায় বসেছে পানের পাইকারি দোকান। পুরো প্রাঙ্গণ ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাক স্ট্যান্ড হিসেবে। হলের বিভিন্ন স্থানে ছিন্নমূল মানুষ অবস্থান করছে।

এক সময় যে ‘ভাসানী হল’ প্রাঙ্গণে নাটক, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বইমেলা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক নানা আয়োজনে প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকত। সে প্রাঙ্গণ এখন সন্ধ্যা নামলেই অপরাধী আর মাদকসেবীদের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। এতে জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে দিনে হলের বারান্দায় বসে পানের দোকান আর প্রাঙ্গণটি ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাক স্ট্যান্ড হিসেবে। আর সন্ধ্যার পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। সূর্য ডোবার সাথে সাথে শুরু হয় মাদকসেবীদের আনাগোনা। এর পাশাপাশি চলে অসামাজিক কর্মকাণ্ড। তৈরি হয় এক ভীতিকর পরিবেশ।

তারা জানান, এটি শুধু ইট-সিমেন্টের একটি স্থাপনা নয়। টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলার গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর ‘টাঙ্গাইল টাউন হল’ নামে মিলনায়তনটি নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৮ সালের ২এপ্রিল ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার খানে আলম খান মিলনায়তনটি উদ্বোধন করেন।

পরবর্তীকালে টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান সামছুল হকের উদ্যোগে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ভাসানী হল’। 

প্রায় ১ হাজার আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনটি একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। 

এরপর থেকেই এটি জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায় এবং অনন্য ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ভবনটি সংস্কারের অভাবে বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রায় এক যুগ আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

বিশিষ্ট কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাহমুদ কামাল বাসস’কে বলেন, কয়েক দশক ধরে টাঙ্গাইলের নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বইমেলা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মহামিলনক্ষেত্র ছিল এটি। হলটি বিগত সরকারও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ‘ভাসানী হলটি পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হোক।

কালচারাল রিফর্মেশন ফোরাম টাঙ্গাইলের সভাপতি আবুল কালাম মোস্তফা লাবু বাসস’কে বলেন, টাঙ্গাইলকে বলা হয় সাংস্কৃতিক নগরী। কিন্তু এ নগরীতে একটি সুন্দর ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। এক সময় ‘ভাসানী হল’ ঘিরে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত, তা বন্ধ হয়ে গেছে এক যুগ আগেই। তাই দ্রুত হলটি পুন:নির্মাণ জরুরি হয়ে উঠেছে।

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য সচিব ও মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র মাহমুদুল হক সানু বাসস’কে বলেন, ‘ভাসানী হল’ সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নামে নামকরণ করা হয়েছে বিধায় দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। 

টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান বাসস’কে বলেন, এক সময় ‘ভাসানী হল’ টাঙ্গাইল সাংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে অর্ধশতবছরের পুরোনো টাঙ্গাইল ভাসানী হল মিলনায়তনটি এখন পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। 

টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বাসস’কে বলেন, ‘ভাসানী হল’ ছিল টাঙ্গাইলের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এ হলকে ঘিরে নাটক, সঙ্গীত, আলোচনা সভাসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হতো। ফলে টাঙ্গাইল সারা দেশে একটি সাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ভাসানী হলটি তার জৌলুস হারিয়েছে।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঐতিহাসিক ভবনটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। 

তিনি জানান, আমি গত ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেছি। মওলানা ভাসানীর স্মৃতি ধরে রাখতে খুব দ্রুতই ভাসানী হল মিলনায়তনটি আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।