শিরোনাম

রেজাউল করিম মানিক
রংপুর, ৬ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : তিস্তা পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ মূলত বন্যা ও নদীভাঙন এবং শুস্ক মৌসুমে পানির চরম সংকট। বর্ষকালে বাড়ি ঘর বিলীন হয় নদীগর্ভে, আর শুস্ক মৌসুমে সেচের অভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ায় চরম দারিদ্রতায় জীবনযাপন করতে হয় এ অঞ্চলের মানুষের।
তিস্তা নদীর পানি বাড়লে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি, আর পানি কমে গেলে দেখা দেয় ভাঙন পরিস্থিতি। বন্যা আর ভাঙনের কষাঘাতে চরম কষ্টে বসবাস করছেন রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের মানুষ। লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা এ পাঁচ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী বিপুল সংখ্যক পরিবারের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিনচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি জানান, গতকাল বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত তিস্তা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তাদের বাড়ি-ঘরে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তাদের গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় বুধবার বিকেলে তারা গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছেন। জমিতে লাগানো রোপা আমন ধানের চারা পানিতে তলিয়ে গেছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে খেত থেকে নদীর পানি নেমে না গেলে রোপল করা ধান গাছের ক্ষতি হবে।
’হামরাগুলা তিস্তাপাড়োত কষ্ট করি বাঁচি আছি। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ আর নাই। তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার কষ্ট, আর পানি নামি গ্যাইলেও হামারগুলার কষ্ট। পানি বাড়লে বান হয় আর পানি নামি গ্যালি নদীভাঙন শুরু হয়। হামারগুলার খালি বিপদ আর বিপদ।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, বুধবার রাতে তার বাড়িতে হাঁটু পানি ছিলো। তারা বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাপদে চলে এসেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমছে। আবারো তিস্তায় পানি বাড়তে পারে। গেল দেড় মাসধরে তিস্তা নদীর পানি ওঠানামা করছে। পানি একটু বাড়লেই তিস্তাপাড়ে বন্যা দেখা দেয়, আর পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে দেখা দেয় ভাঙন। গেল একমাসে তাদের গ্রামে প্রায় ২০০টি বসতভিটা নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন,’ হামার বাড়িটাও নদীর কাচারোত পড়ি গ্যাইছে। এইবার ভাঙন শুরু হইলে বাস্তুভিটাটা আর বাঁচা যাবার নয়। ১০ শতক বাস্তুভিটার জমিকোনায় মোর শ্যাষ সম্বল।’

কালীগঞ্জের শৈলমারী চরের কৃষক হযরত আলী বলেন, বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত নদীর পানিতে তাদের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে ঘরের ভেতর নদীর পানি। গ্রামের সবগুলো রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। আজ সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। ‘তিস্তাত অল্প এ্যাকনা পানি বাড়লে হামারগুলার বাড়ি-ঘরোত পানি ঢুকি যায়। পানি বাড়লে হামার এত্যি (এদিকে) বান হয় আর পানি কমি গ্যাইলে ভাঙন হয়। বান আর ভাঙনোত পড়ি হামরাগুলা প্রতনিয়িত জমি হারবার নাইকছি। হামারগুলার কপালোত সুখ আর নাই।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) জানায়, আজ বৃহস্পতিবার ভোর ৬টায় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১০ মিটার যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে (বিপৎসীমা ৫২.১৫ মিটার)। সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে আরো ২ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পায়। রংপুরের কাউনিয়া ও গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গতকাল বুধবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বাসস’কে বলেন, বুধবার তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হলেও বৃহস্পতিবার সকালে পানি কমে বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কমা অব্যাহত রয়েছে। উজানে ভারতথেকে পাহাড়ি ঢলের পানি না এলে তিস্তার পানি বাড়বে না।

তিনি বলেন, ‘এভাবেই গেল দেড় মাসধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। তিস্তাপাড়ে সাধারনত ফ্লাশ ফ্লাড হয়ে থাকে। বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টার মধ্যে পানি নেমে যায়।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছরে রংপুর অঞ্চলের ৩ দফা বন্যায় পাঁচ শতাধিক বসত বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে তৃতীয় দফার স্বল্প মেয়াদী বন্যায় ৯ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করে প্রনোদনা দেওয়া হবে।