শিরোনাম

জিগারুল ইসলাম
চট্টগ্রাম, ৫ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর আড়াইটার দিকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে পালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই বদলে যায় চট্টগ্রামের চিত্র।
রাজপথে নেমে আসেন লাখো ছাত্র-জনতা। ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা আর শোককে কাটিয়ে বন্দরনগরীর আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে বিজয়ের উল্লাসে। বাসাবাড়ি, অফিস ও দোকানপাট থেকে দলে দলে মানুষ যোগ দিতে থাকেন সেই উদযাপনে। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা আর মুখে বিজয়ের স্লোগান।
বিকেল থেকে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মিষ্টি বিতরণ শুরু হয়। পরিচিত-অপরিচিত সবাই একে অপরকে আলিঙ্গন করতে থাকেন। আনন্দে অনেককে কাঁদতেও দেখা যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই থমথমে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই থমথমে চট্টগ্রাম পরিণত হয় বিজয়ের উৎসবে মুখর এক নগরীতে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহবধূ থেকে শুরু করে নারী শ্রমিক ও অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজয় মিছিলে অংশ নেন। গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কই ছিল মুক্তিকামী মানুষের দখলে।
হাসিনার পালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় নগরীর বিভিন্ন থানা থেকে কর্মকর্তাসহ পুলিশ সদস্যরা সরে যান। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ তাদের নিরাপদে চলে যেতে সহায়তা করেন। তবে কিছু স্থানে পুলিশের ওপর চড়াও হন বিক্ষুব্ধ লোকজন।
নিউমার্কেট মোড় : আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র থেকে বিজয়ের মঞ্চ, জুলাই আন্দোলনের পুরোটা সময় চট্টগ্রামের নিউমার্কেট মোড় ছিল প্রতিরোধ ও সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র। ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্তও সেখানে ছিল থমথমে উত্তেজনা। কিন্তু দুপুরের পর যখন সরকারের পতনের খবর নিশ্চিত হয়, তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো চারপাশের গলি ও রাজপথ থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় নিউমার্কেট চত্বরে।
জাতীয় পতাকা হাতে যুবক, প্রবীণ ও নারীরা নেমে আসেন রাস্তায়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। সেই কান্না ছিল হাজারো শহীদের ত্যাগের পর পাওয়া স্বস্তির। তবে এদিন রাজপথে নেমে আসা উল্লাসরত মানুষজন বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রতিপক্ষের বাসাবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তিতে হামলা চালায়নি। যা আওয়ামী লীগের নেতারা শুরু থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল।
কাজির দেউড়ি : কাজির দেউড়ি মোড়ে সেদিন চারপাশ থেকে মানুষ সড়কে নেমে আসে। ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক হাসিনার পলায়নের খবরে লাখো জনতা উল্লাস করতে থাকে। পুলিশের একটি দলকে ধাওয়া দিয়ে সার্কিট হাউজে ঢুকিয়ে দেয় ছাত্র-জনতা। চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভের পাশাপাশি স্বৈরাচারের পতনে উল্লাসে মেতে উঠেন। বিপরীতে পালাতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
বহদ্দারহাট থেকে জিইসি : বিজয়ের দীর্ঘ মিছিল নিউমার্কেটের পাশাপাশি আন্দোলনের অন্যতম রক্তস্নাত এলাকা বহদ্দারহাটেও সেদিন নেমেছিল জনতার ঢল। যে এলাকায় কয়েকদিন আগেই ঝরেছিল তাজা প্রাণ, সেই রাজপথেই সেদিন ধ্বনিত হয় জয়ের গান। মিছিলের পর মিছিল এসে মিশেছিল জিইসি, লালখান বাজার ও ওয়াসা মোড়ে। রিকশা, বাইক, ট্রাকÑযে যেভাবে পেরেছে সেই পরিবহনে চড়ে বসেছে, হাতে ছিল লাল-সবুজ পতাকা। মিষ্টি বিতরণ আর স্বৈরাচার পতনের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো নগরী।
বড় পোল : বিকাল ৪টা পর্যন্ত নগরের বড় পোল এলাকায় সেদিন হাজারো জনতা ভিড় করে। একাধিক এস্কেভেটর দিয়ে শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙতে থাকে নগরবাসী। শত শত মানুষ মুঠোফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন। বিকেল গড়াতেই বিভিন্ন স্থাপনায় মুজিবের ভাস্কর্য, হাসিনার ছবিসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ব্যানার, বিলবোর্ড, অফিস, চাঁদাবাজির কেন্দ্রগুলো পুড়িয়ে দিতে থাকে জনতা। এক কথায় ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের আগে থেকেই পুরো শাসনব্যবস্থা জনগণের হাতে চলে যায়। ভেঙে পড়ে ফ্যাসিবাদী পরাধীনতার শিকল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর খবরে মানুষের আনন্দ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা উপলব্ধি করি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাই সহপাঠীদের নিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নামি। আমাদের কেউ কেউ উপাসনালয় পাহারার কাজও করে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের অনুপস্থিতির সুযোগে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন থানায় হামলা, ভাঙচুর ও কিছু লুটপাট চালায়। ওইদিন প্রায় সবকটি থানায় হামলার চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো কোনো এলাকায় সচেতন লোকজনের বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি-জামায়াতসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীকে থানা, সরকারি অফিস দুর্বৃত্তদের হামলা থেকে রক্ষায় মধ্যরাত থেকে পরদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, আমার জীবনে এমন দিন আর দেখিনি। দুপুর পর্যন্ত সবাই অপেক্ষায় ছিল। বিকেলে মানুষ আনন্দে রাজপথে নেমে যায়।
তিনি বলেন, শোক আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতিতে সেদিনের সেই বিজয়ের উল্লাসের পেছনে ছিল গভীর বেদনার ইতিহাস। নগরীর ওয়াসার মোড় থেকে শুরু করে সিআরবি, ষোলশহর কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসÑপ্রতিটি ইটের গায়ে লেগেছিল শহীদের রক্তের দাগ। বিজয়োল্লাসে নামা মানুষের কণ্ঠে তাই আনন্দের পাশাপাশি ছিল শহীদ ওয়াসিম, হৃদয় এবং শান্তদের হারানোর গভীর শোক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সেই অপরাহ্ন ছিল চট্টগ্রামের জন্য নতুন ভোরের প্রতীকও। স্বৈরাচারের ভয়াল কালো ছায়া কাটিয়ে একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে সেদিন এক হয়েছিল পুরো বন্দরনগরী।
চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী সাদমান করিম বলেন, ৬ আগস্ট সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নামেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। জিইসি মোড়, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর ও আর নিজাম রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বিভিন্ন এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা করেন শিক্ষার্থীরা। নগরীর জেএমসেন হল, পাথরঘাটসহ বিভিন্ন মন্দির এবং কয়েকটি গির্জার সামনে তাঁদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও মাইকিং করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার আহ্বানও জানানো হয়।