বাসস
  ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৪৮

ঘরে বসে ফসলের রোগ শনাক্ত করবে মডেশ চাকমার উদ্ভাবিত ‘ক্রপস ডক্টর’ 

ছবি : বাসস

রোস্তম আলী মন্ডল

দিনাজপুর, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : কৃষিকে অধিক সহজ ও প্রযুক্তি নির্ভর করতে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)’র  শিক্ষার্থী মডেশ চাকমা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্বলিত স্মার্ট কৃষিসেবা প্ল্যাটফর্ম ‘ক্রপস ডক্টর’ উদ্ভাবন করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি স্মার্ট কৃষিসেবা প্ল্যাটফর্ম ক্রপস ডক্টর-এর মাধ্যমে কৃষকরা ঘরে বসেই ফসলের রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন এবং সঠিক সমাধান পেতে পারেন।

হাবিপ্রবির কৃষি অনুষদের ছাত্র উদ্ভাবক মডেশ চাকমা বাসসের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘ক্রপস ডক্টর’ কৃষি কাজে সহজে ব্যবহারযোগ্য ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত স্মার্ট কৃষিসেবা প্ল্যাটফর্ম । প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষি সেবা সহজ করতেই এই উদ্ভাবন।

তিনি বলেন, ‘ক্রপস ডক্টর’ প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে ফসলের রোগবালাই দ্রুত শনাক্ত করা এবং ঘরে বসেই কৃষকদের সঠিক ও সময় উপযোগী পরামর্শ প্রদান করা। মাঠ পর্যায়ে কৃষি ক্ষেত্রে ফসলের বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই শনাক্ত ও সম্ভাব্য সমাধানের জন্য তার প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে বিস্তারিত গবেষণায় ‘ডিজিজ ডিটেক্টর’ ফিচার। এই ফিচারটির মাধ্যমে আক্রান্ত ফসল ও গাছের ছবি আপলোড করলেই, বিজ্ঞানভিত্তিক আবিষ্কৃত এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহজেই ফসলের রোগ-বালাই শনাক্ত করে ফেলা যায়। সেই সাথে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে ফসলের সম্ভাব্য সমস্যার সমাধানও খুঁজে পাওয়া যায়। 

বর্তমানে প্ল্যাটফর্ম টি ধান, গম, ভুট্টা, আলু, টমেটো, চা, আখ, পাট, সরিষা, আম, কলা, বেগুন, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও হলুদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফসলের রোগ-বালাই সহজেই শনাক্ত ও সমাধানে সহায়ক। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফসলের রোগবালাই নিরসনে উপকৃত হচ্ছে। ফলে প্ল্যাটফর্মটি ইতোমধ্যেই কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। 

দেশের বাইরের কৃষকদের কথা চিন্তা করে, প্ল্যাটফর্ম টিতে বাংলা ভাষার পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে ইংরেজি ভাষা। ইতোমধ্যেই এই তরুণ উদ্ভাবক চেষ্টা করছেন, আরও কিছু ভাষা যুক্ত করার। যাতে করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিকাজে যুক্ত ফসল উৎপাদন ও ব্যবহারকারীরা সহজেই নিজেদের ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

ডিজিজ ডিটেক্টর ফিচার ছাড়াও কৃষকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে প্ল্যাটফর্ম টিতে যুক্ত করা হয়েছে ফার্টিলাইজার ক্যালকুলেটর। যার মাধ্যমে জমির পরিমাণ ও ফসলের জাত অনুযায়ী রাসায়নিক ও জৈব কোন ধরনের সার কত পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে, তা সহজেই জানা যায়। এছাড়াও প্ল্যাটফর্ম টিতে রয়েছে পেস্টিসাইড ক্যালকুলেটর। এই ক্যালকুলেটর নির্দিষ্ট পরিমাণ কীটনাশক ও পানির মিশ্রণের নিরাপদ হিসাব দিতে সহায়তা করে।

মডেশ চাকমা বলেন, ফসলের চাষাবাদের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে সময়ভিত্তিক নির্দেশনা দিতে প্ল্যাটফর্ম টিতে রয়েছে ক্রপ ক্যালেন্ডার। পাশাপাশি কৃষিসংক্রান্ত যে কোন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর ও পরামর্শ দিতে যুক্ত করা হয়েছে, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সচল এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে প্ল্যাটফর্ম টিতে স্যাটেলাইট ও ইউএভি ( ড্রোন) অ্যানালাইসিস সুবিধাও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বৃহৎ কৃষি-জমি পর্যবেক্ষণ, ফসলের অবস্থা বিশ্লেষণ এবং মাটির উর্বরতা মূল্যায়ণের সুযোগ রয়েছে। 

তরুণ এই উদ্ভাবকের মতে, ক্রপস ডক্টর শুধু একটি প্রযুক্তি পণ্য নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার হাতিয়ার। এটি ব্যবহারের ফলে সময়মতো ফসলের রোগ-বালাই শনাক্তে ফসলের ক্ষতি কম হবে। সেই সাথে সঠিক ও পরিমাণ মতো সার ব্যবহারে কৃষকের খরচ সাশ্রয় হবে এবং মাটিও সুরক্ষিত থাকবে। 

মডেশ চাকমা বলেন, ‘ক্রপস ডক্টর এআই এর লক্ষ্য হলো, দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ কৃষকও যেন বড় বাণিজ্যিক খামারের মতো একই মানের কৃষি পরামর্শ পায়। সে বিষয়টি সঠিকভাবে কৃষকদের প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা। এআই ব্যবহার করে ফসল রক্ষা করা, ফসলের উৎপাদন অধিক বাড়ানো এবং প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার স্বপ্ন।’

তিনি বলেন, আমেরিকা, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশের কৃষকরাও আমাদের এই প্ল্যাটফর্ম টি ব্যবহার শুরু করছেন। তারা যাতে প্ল্যাটফর্ম টি সহজেই ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য “ক্রপস ডক্টর” অ্যাপস হালনাগাদ করার বিষয়ে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে । আশা করি, খুব শীঘ্রই আমরা ওয়েব প্ল্যাটফর্ম টিকে ‘অ্যাপস’ হিসেবে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত কৃষকদের সবার হাতে পৌঁছে দিতে পারবো।

হাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এনামউল্যা জানান, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বিভাগের সাথে সংযুক্ত গবেষণামূলক উচ্চতর প্রতিষ্ঠান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অনেকেই গবেষণার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণা কাজে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করে চলেছে। 

তিনি বলেন, কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী মডেশ চাকমা আধুনিক প্রযুক্তির কৃষি সহজীকরণে যে উদ্ভাবন করেছেন তা প্রশংসনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছে। এধরণের গবেষণা কার্যক্রম প্রতিনিয়ত হাবিপ্রবিতে চলমান রয়েছে।