শিরোনাম

//বেলাল রিজভী//
মাদারীপুর, ২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতায় গরুর খামার গড়ে মাদারীপুরের নুসরাত জাহান সাথী সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গরু পালন ও বিক্রির মাধ্যমে শুধু আর্থিকভাবেই স্বাবলম্বী হননি, নিজের এলাকায় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন।
তার এ উদ্যোগ স্থানীয় নারীদের মাঝে আত্মকর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক পশুপালনের আগ্রহ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদারীপুর শহরের সৈয়দারবালী এলাকার বাসিন্দা কাজী এমারত হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় কালকিনি উপজেলার রাজদী এলাকার নুসরাত জাহান সাথীর। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি দেখেন, তার শ্বশুর দীর্ঘদিন ধরে গরু পালন করছেন। পরিবারের এমন পরিবেশ তাকে অনুপ্রাণিত করে। পরে স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় ২০১৯ সালে বাড়ির সামনেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘আমীরা ডেইরি ফার্ম’।
শুরুতে মাত্র ১০টি গরু নিয়ে ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে প্রথম বছর কয়েকটি গরু মারা যায়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। তবে নুসরাত ব্যর্থতায় ভেঙ্গে পড়েনি। এ সময়টাতে থেমে না থেকে খামার ব্যবস্থাপনা, গরুর খাদ্য, পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে এবং একসময় তার খামারে ৪০টিরও বেশি গরু পালন করেন।
কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় সাথী গত কোরবানির ঈদে এক কোটি টাকার বেশি মূল্যের গরু বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তার খামারে ৯টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দুগ্ধবতী গরু।
নুসরাতের তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র দুই বছর হওয়ায় তাদের দেখাশোনার পাশাপাশি খামারের কাজও সমানভাবে সামলাচ্ছেন। ভবিষ্যতে সন্তানরা বড় হলে আবারও খামারের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
গরুর পাশাপাশি তিনি হাঁস, মুরগি ও কবুতরও পালন করছেন। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৮০টি হাঁস, ৪০টি মুরগি এবং ২০ জোড়া কবুতর রয়েছে। এসব থেকে বাড়তি আয় হচ্ছে এবং তিনি একটি সমন্বিত প্রাণিসম্পদ খামার গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছেন।
খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি কেজি খৈলের দাম ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা, গমের ভুষি ৪২ থেকে ৪৮ টাকা এবং ধানের কুঁড়া বা ভুষি ২৮ থেকে ৩৫ টাকা। এছাড়া সবুজ ঘাসের আঁটি ২৫ থেকে ৪০ টাকা এবং নেপিয়ারসহ বিভিন্ন জাতের ঘাস প্রতি কেজি ৮ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলে একটি মাঝারি আকারের গরুর পেছনে প্রতিদিন ব্যয় করতে হয় প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার খাদ্য।
তারা জানান, মোটাতাজাকরণের জন্য সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কেনা হয়। কয়েক মাস পরিচর্যা ও সুষম খাদ্য দেয়ার পর সেগুলো বাজারজাত করা হয়। অন্যদিকে দুগ্ধ খামারের জন্য বাছুর বা ছোট গাভী কিনে দীর্ঘ সময় লালন-পালন করতে হয়।
তারা আরও বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা একটি গরুও পরবর্তীতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব। এতে ভালো লাভের পাশাপাশি খামারিদের বিনিয়োগও দ্রুত ফিরে আসে।
প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ২০টি গরু নিয়ে একটি বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলতে অবকাঠামো নির্মাণ, গরু ক্রয়, খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা ও প্রাথমিক পরিচালন ব্যয়সহ আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। জমি নিজস্ব না হলে এ ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। তবে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত চিকিৎসা ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ ধরনের খামার থেকে ভালো মুনাফা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নুসরাত জাহান সাথী বাসস’কে বলেন, ‘১০টি গরু নিয়ে ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে প্রথম বছর কয়েকটি গরু মারা যাওয়ার পর খুব ভেঙে পড়েছিলাম।
কিন্তু পরিশ্রম আর ধৈর্য হারাইনি। এখন প্রতিটি গরুকেই নিজের সন্তানের মতো যত্ন করি। সময়মতো খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চিকিৎসা ও টিকাদান নিশ্চিত করি। আমি চাই, আমার মতো আরও নারীরা উদ্যোক্তা হয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলান। সরকারি প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা আরও বাড়ানো হলে অনেক নারী এ খাতে এগিয়ে আসবেন বলে আমার বিশ্বাস’।
খামারের কর্মচারী সোলেমান শেখ বলেন, ‘গরু পালন একটি কষ্টসাধ্য কাজ। তবে নিয়ম মেনে পরিচর্যা করলে এটি লাভজনক পেশা। প্রতিদিন দুই বেলা খাবার দিতে হয়, গোসল করাতে হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে রোগবালাইও অনেক কম হয়।’
নারী উন্নয়ন সংগঠন ‘নকশি কাঁথা’র সভাপতি নুরুন্নাহার জুই বলেন, ‘গরু পালন অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ।
সেখানে একজন নারী হিসেবে সাথীর সফলতা অন্য নারীদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। তার মতো উদ্যোক্তা বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।’
মাদারীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) ড. মোহাম্মদ আছির উদ্দিন বাসস’কে বলেন, ‘আমরা উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খামার পরিচালনার বিষয়ে সহযোগিতা দিয়ে থাকি। নুসরাত জাহান সাথীর মতো উদ্যোক্তারা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। তার দেখাদেখি আরও অনেক নারী-পুরুষ বাণিজ্যিকভাবে পশুপালনে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি।’