শিরোনাম

॥ বিপুল ইসলাম ॥
লালমনিরহাট, ৩০জুলাই ২০২৬ (বাসস): ছয় দশক ধরে নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে জেলার ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসার পাশাপাশি জেলার খাদ্য ঐতিহ্য, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং উত্তরাঞ্চলের আতিথেয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা লালমনিরহাটের মানুষের কাছে মিষ্টির নাম উচ্চারিত হলেই যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের কথা সবার আগে আসে, তার মধ্যে অন্যতম ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। প্রায় ছয় দশক ধরে খাঁটি দুধ, নিজস্ব রেসিপি এবং মানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি শুধু লালমনিরহাট নয়, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তান আমলে লালমনিরহাট শহরের গোশালা বাজার ছিল জেলার অন্যতম ব্যস্ত ব্যবসাকেন্দ্র । ১৯৬৭ সালেট প্রয়াত সুবল চন্দ্র সাহা প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। সময়ের পরিবর্তন, বাজারের প্রতিযোগিতা ও নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠার ৫৯ বছর পরও পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে সাহা পরিবার। বর্তমানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দোকানজুড়ে বেড়ে যায় কর্মব্যস্ততা। লাকড়ির চুলায় ফুটছে দুধ, বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে ক্ষীর। একদিকে কারিগররা ব্যস্ত রসগোল্লা, চমচম, রসমালাই, কালোজাম, লালমোহন, পান্তুয়া, রাজভোগ, ক্ষীরমোহন, দই ও নানা ধরনের সন্দেশ তৈরিতে, অন্যদিকে কাউন্টারে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি। সদ্য প্রস্তুত মিষ্টির সুগন্ধে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ৭০বছর বয়সী শ্যামল কুমার সাহা বাসসকে বলেন, তার বাবা সুবল চন্দ্র সাহার হাত ধরে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৫০ বছর আগে তিনি নিজেও এ ব্যবসায় যুক্ত হন। বর্তমানে তার ছোট ভাই কমল কুমার সাহা এবং ভাইয়ের ছেলে অরিত্র সাহা পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার দায়িত্বে সহযোগিতা করছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও সুনাম অটুট রাখাই তাদের লক্ষ্য।
তিনি জানান, প্রতিদিন মিষ্টি তৈরিতে ৮ থেকে ১০ মণ দুধ প্রয়োজন হয়। তবে ঈদ, দুর্গাপূজা, কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে এই চাহিদা বেড়ে ২০ থেকে ২৫ মণে পৌঁছে যায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ১২ থেকে ১৪ জন কর্মচারী কাজ করছেন। সাধারণ দিনে বিক্রি হয় প্রায় ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মিষ্টি। ঈদের পরবর্তী সময়সহ বিশেষ মৌসুমে দৈনিক বিক্রি এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
শ্যামল কুমার সাহা বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে প্রতি কেজি মিষ্টির দাম ছিল মাত্র দেড় থেকে দুই টাকা। বর্তমানে মিষ্টির ধরনভেদে প্রতি কেজির দাম ২৬০ থেকে ৬০০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ কেজি মিষ্টি বিক্রি হয়। বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিক্রি আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফোনে অর্ডার আসে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মিষ্টি পাঠানো হয়।
প্রতিষ্ঠানের আরেক স্বত্বাধিকারী কমল কুমার সাহা বাসসকে বলেন, একসময় গোশালা বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি মিষ্টির দোকান ছিল। তখন থেকেই ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ মানুষের আস্থা অর্জন করে। দীর্ঘদিন ধরে মানের সঙ্গে আপস না করায় আজও ক্রেতাদের বিশ্বাস অটুট রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রবীণ কর্মী উকিল চন্দ্র বর্মন ৫২ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি বাসসকে বলেন, ‘আমরা শুধু খাঁটি দুধের ছানা ব্যবহার করি। ভেজালের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি মিষ্টি একই মান বজায় রেখে তৈরি করা হয়।’
দোকানের কর্মচারী সুজন কুমার রায় বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ক্রেতার সমাগম হয়। দীর্ঘদিনের ক্রেতাদের সন্তুষ্টিই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
স্থানীয় বাসিন্দা কৃষব চন্দ্র রায় বাসসকে বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ লালমনিরহাটের আস্থা ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
নিয়মিত ক্রেতা আলমগীর হোসেন বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ প্রতিষ্ঠানের মিষ্টির চাহিদা রয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা অতিথি ও প্রবাসীরাও এখানকার মিষ্টি সঙ্গে নিয়ে যান।
লালমনিরহাট পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিশ্বজিৎ কুমার বণিক বাসসকে বলেন, পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও মিষ্টির মান সন্তোষজনক পাওয়া গেছে।
একসময় একটি ছোট পারিবারিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা ‘প্রদীপ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ আজ লালমনিরহাটের ঐতিহ্য, স্বাদ ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।