শিরোনাম

ঢাকা, ২৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে ক্রমবর্ধমান বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাংলাদেশে আরও নির্ভুল বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অধিক বিনিয়োগ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, সময়োপযোগী পূর্বাভাস প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। তাই দেশের বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, আগাম নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পাওয়া গেলে পানি জমার আগেই ড্রেনেজ পাম্প চালু করা, জরুরি সেবা সক্রিয় করা এবং মানুষকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর আবহাওয়া রাডার, তাৎক্ষণিক বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আবহাওয়া, পানি সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি পূর্বাভাস সক্ষমতা, প্রস্তুতি এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিরও আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা শহরের খাল, জলাভূমি ও আশপাশের জলাধার পুনঃসংযুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি নগর পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করা উচিত।
তার মতে, বছরের পর বছর অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে খাল ও জলাভূমি দখল, পুকুর ও নিচু এলাকা ভরাট এবং উন্মুক্ত সবুজ স্থান হারিয়ে যাওয়ায় রাজধানীর প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্ষতিগ্রস্ত জলাভূমি পুনরুদ্ধার, রিটেনশন পুকুর সংরক্ষণ ও নির্মাণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (রেইনওয়াটার হারভেস্টিং) কার্যকর করার পরামর্শ দেন।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অংশ হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে উৎসাহিত করতে হবে। বৃষ্টির পানিকে বর্জ্য নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা শুধু জলাবদ্ধতা কমাবে না, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমাবে।
তিনি প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুর পর তা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে নগর বন্যা, নদীবন্যা, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং নিম্নাঞ্চলের বন্যাসহ বিভিন্ন ধরনের বন্যা দেখা যায় এবং প্রতিটির জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বন্যার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মৌসুমি নিম্নচাপের কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা দেশের পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে। আর্দ্রতাসমৃদ্ধ বায়ু পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠলে তীব্র ওরোগ্রাফিক বৃষ্টিপাত ঘটে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি চট্টগ্রামে একদিনে প্রায় ৪১৩ মিলিমিটার এবং তিন দিনে প্রায় ৮৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা নদী ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ ধরনের অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে।
তিনি বলেন, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ও খাল দখল, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেও নগর এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আবর্জনা জমে অনেক ড্রেনই তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। যত নতুন ড্রেনই নির্মাণ করা হোক না কেন, বিদ্যমান ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে সেগুলো কার্যকর হবে না।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নগর মহাপরিকল্পনা, ভবন নির্মাণবিধি ও জোনিং নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়নের পাশাপাশি ড্রেনেজ অবকাঠামো ও বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, নির্ভুল পূর্বাভাস, বিজ্ঞানভিত্তিক নগর পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিস্তৃত ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে বন্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।