বাসস
  ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩৪

চট্টগ্রামের বৃক্ষমেলায় বদলে গেছে-‘গাছের গল্প’

ছবি: সংগৃহীত

// আবু মোশাররফ //

চট্টগ্রাম, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘির মাঠে চলছে বৃক্ষমেলা। মেলায় প্রবেশ করে প্রথম স্টলটির সত্ত্বাধিকারীর কাছে প্রশ্ন ছিল- ‘এবার মেলায় কোন্ ধরনের চারার চাহিদা বেশি?’ তার উত্তর, ‘দেশীয় প্রজাতির ফলদ গাছের। আম, জাম, আমড়া, আতা, পেয়ারা, বরই, লেবুর পাশাপাশি ঔষধি গুণের আমলকির চারার চাহিদাও ভালো। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা দলবেঁধে এসে চারা কিনছেনÑতারা হরিতকি, বহেরা, অড়বরই এসব গাছের চারারও খোঁজ করছেন।’

‘শিক্ষকরা দলবেঁধে মেলায় আসছেন কেন?’ জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ‘স্কুল-কলেজের চারপাশ কিংবা আঙিনায় লাগাবেন।’

তার সাথে আলাপের সূত্রে জানা গেল, বর্তমান সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সারা দেশে ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠন ও দপ্তরের কর্মকর্তারা মেলায় এসে দেশীয় প্রজাতির ফলদ গাছের চারা কিনছেন, তারা দেশ থেকে ‘প্রায় বিলুপ্ত’ হতে যাওয়া ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছের চারার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। চাহিদা থাকায় নার্সারির মালিকরা সেসব গাছের চারাও মেলায় নিয়ে আসছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মানে ছিল একটা ‘মৌসুমি কর্মসূচি’Ñকয়েকটি চারা লাগানো, ছবি তোলা, তারপর পরিচর্যার অভাবে সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া। এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে।

দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার যে কতটা আন্তরিক এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তার প্রতিফলন দেখা গেল লালদীঘির বৃক্ষমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (১১ আগস্ট, মঙ্গলবার)। সেদিন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘সরকার দেশকে সবুজায়ন করার লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরে যে ২৫ কোটি লাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার পূরণে সংশ্লিষ্ট সকলকে সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই সরকার আমি-ডামির সরকার নয়; জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরকার। সুতরাং, এখানে কোনো ধরনের ফাঁকি দেওয়া চলবে না। কোথায় কত গাছ লাগানো হচ্ছে তা অক্ষরে অক্ষরে হিসাব নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগ, নিয়মিত প্রচারণা, জোরালো মনিটরিং এবং পরিবেশ সচেতনতার কারণে গাছ লাগানো ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অভ্যাস ও সামাজিক অংশগ্রহণে পরিণত হচ্ছে। তারই দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে এবারের বৃক্ষমেলায়, পুরোপুরি বদলে গেছে- ‘গাছের গল্প।’

‘ইসলামাবাদ নার্সারির’ স্বত্ত্বাধিকারী মো. আবদুর রহিম বাসসকে বলেন, ‘দেশীয় ফলদ ও ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছের চারার প্রতি মানুষের আগ্রহ খুব বেড়েছে। শহরে গাছ লাগানোর পর্যাপ্ত জায়গার অভাব আছে, তাই অনেকে এখন ছাদে বাগান করছেন। ছাদ বাগানে আম, জাম, আমড়া, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, সফেদা, আনার বা ডালিম গাছের চারা লাগান। এর বাইরে সবজি-মসলা জাতীয় উদ্ভিদের চারা যেমনÑ বেগুন, মরিচ, টমেটো, লেটুসপাতা, পুদিনা পাতা ইত্যাদিও লাগান। এগুলো বীজ এবং চারা দুইভাবে পাওয়া যায়।

তবে চারার চাহিদা বেশি।’ তিনি জানান, দেশীয় প্রজাতির ফলদ গাছের চারা জাত ও আকার ভেদে সর্বনিম্ন ২শ’ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা, সবজির চারা প্রতিটি সর্বনিম্ন ৩০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা এবং বিদেশি ফলের চারা সর্বনিম্ন ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মেলায় গাছের চারার পাশাপাশি গাছ লাগানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ছাদ বাগানের জন্য মাটির তৈরি টব, প্লাস্টিকের কন্টেইনার, বক্স, কোদাল-নিড়ানি, পানি ছিটানোর মেশিন, সার-কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণও বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃক্ষমেলায় ২০-২৫টি নার্সারির স্টলে থরে থরে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারায় ‘সবুজ-সমারোহে’ ভরে উঠেছে পুরো লালদীঘি মাঠ। তরতাজা চারাগুলোর কোনোটি মায়া ছড়িয়েছে রঙিন ফুলে, কোনোটিতে এসেছে ফলন, ধরেছে আস্ত কোনো ফল। ক্রেতা-দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন আর একেকটি চারা হাতে নিয়ে সেটির জাত, ফলন, আকার এবং কতদিনে ফল আসেÑসেসব তথ্য জানতে চাইছেন।

‘ফতেয়াবাদ নার্সারির’ মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘আগে মেলায় ফুলের গাছ আর শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা বিক্রি হতো বেশি কিন্তু এখন ফলদ গাছের চারার চাহিদা অনেক বেড়েছে।’ তার মতে, ‘মানুষের মানসিকতায়ও পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেকে গাছ লাগানোকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না। এখন গাছকে সম্পদ হিসেবে দেখছেন। গাছ লাগালে পরিবেশ ঠাণ্ডা থাকবে, ফল দেবে সে হিসাব মানুষ বুঝতে পারছে।’

নার্সারির মালিকরা বলছেন, ‘গাছের প্রতি মানুষের একটা নিবিড় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এখন গাছ নির্বাচনেও মানুষ যথেষ্ট সচেতন। শুধু চারা কিনলেই হবে না কোন্ মাটিতে কোন্ গাছ ভালো হবে, কতটুকু আলো-বাতাস প্রয়োজন, কতদিন পর ফল দেবে, কিভাবে পরিচর্যা করতে হবেÑএসব বিষয়েও তারা জানতে চাইছেন।’

বৃক্ষমেলায় আসা নগরীর পাঁচলাইশ হিলভিউ এলাকার বাসিন্দা তানজিলা আক্তার বাসসকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় বড় কোনো জায়গা নেই। ছাদে টবে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছি। এবার আম, লেবু, পেয়ারা ও একটি কামরাঙার চারা নিতে এসেছি।’

মেলায় গাছ কিনতে আসা মেরন সান কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, ‘একটা গাছ লাগানো মানে শুধু নিজের জন্য কিছু করা নয়; পুরো দেশের জন্য অবদান রাখা।

আমার মনে হয়, শহরে প্রত্যেক বাড়িতে যদি কয়েকটি করে গাছ থাকে, তাহলে পরিবেশ অনেকটা বদলে যাবে। তাই জায়গা কম হলেও ছাদে গাছ লাগানোর চেষ্টা করছি।’ তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘অতীতে কখনো এমন সংখ্যা নির্ধারণ করে গাছ লাগানোর কথা কেউ বলেনি, যা হতো সব লোক দেখানো। এখন বর্তমান সরকার গাছ লাগানোর জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছে, মনিটরিং করছে এটা খুবই ভালো দিক। ২৫ কোটির জায়গা ১০ কোটি গাছও যদি বেচে থাকে তাহলে এই দেশ সবুজে ভরে যাবে।’

এদিকে ‘গাছের গল্পে’ নতুন সংযোজন হয়েছে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ‘বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’। গত জুলাই মাসের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে ‘জুলাই শহীদদের স্মরণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’ পালন করা হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজে ছাত্র-সংগঠনগুলোর উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করা হচ্ছে। এতে বৃক্ষরোপণ ঘিরে একটা উৎসব আমেজ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে ‘শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলো প্রতিদিন পরিচর্যা করে বড় করতে হবে’ বলে মত দিয়েছেন নগর বিএনপির সাবেক সহ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আলমগীর নূর।

বৃক্ষমেলায় তিনি বাসসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দেশের পরিবেশকে বাঁচাতে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সফল করতে হলে গাছের পরিচর্যা করতে হবে। একটা গাছ লাগালাম কিন্তু তার পরিচর্যা করলাম না তাহলে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সরকারি দপ্তরগুলো নিয়মিত গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা গাছ লাগাচ্ছেন তাদেরও নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। তাহলে এই দেশের পরিবেশ আবারও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।