বাসস
  ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫৯
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:১৪

স্বাস্থ্যসেবার অভাবে দুর্ভোগে শিবচরের চরাঞ্চলের দুই হাজার মানুষ

ছবি : বাসস

/ বেলাল রিজভী /

মাদারীপুর, ২৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্যসেবা কেবল অসুস্থতা নিরাময় নয়, বরং শারীরিক মানসিক সুস্থতার পূর্বশর্ত। কিস্তু ২০২১ সালে জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত চরজানাজাত ইউনিয়নে জেগে ওঠা নতুন দুটি দুর্গম চরে বসবাসকারী প্রায় দুই হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। 

চর এলাকায় হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা স্থায়ী চিকিৎসকের কোনো চেম্বার না থাকায় সামান্য অসুস্থতা থেকে শুরু করে প্রসূতি সেবার জন্যও রোগীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীপথে উপজেলা সদর বা নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চল দুটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। অধিকাংশ বাসিন্দা কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তারা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বর, সর্দি, কাশিসহ যে কোনো সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও চরে কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। সরকারি ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও নেই। ফলে অনেকেই স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর হতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতির লক্ষ্যে নতুন সরকার বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে আমরা শুনেছি। তাই আমরা চরবাসী সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি পদ্মা নদীবেষ্টিত চরজানাজাত ইউনিয়নে জেগে ওঠা নতুন দুর্গম চর দুটিতে কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের দাবি জানাই। 

স্থানীয়রা জানান, চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকার বড় একটি অংশ ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে নতুন চর জেগে ওঠে এবং ২০২২ সাল থেকে সেখানে নতুন করে বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে ওই দুটি চরে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস।

চর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে নদীপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে জরুরি রোগী পরিবহনে প্রায়ই জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় রোগী হাসপাতালে নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এলাকায় জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী বাড়িতেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। এতে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বাসস’কে বলেন, ‘রাতে প্রসববেদনা উঠলে নৌকা পাওয়া যায় না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একটি কমিউনিটি ক্লিনিক হলে আমাদের অনেক কষ্ট কমে যেত। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের চিকিৎসার্থে আমাদের চরে একটি হাসপাতাল করে দেয়ার দাবি জানাই সরকারের কাছে।’

স্থানীয় বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা বলেন, ‘অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেক সময় সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে নদী পার হতে হতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায় রোগীর। মাঝে মধ্যে উপজেলা সদর বা নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে যেতে রোগী মারাও যায়’।

তাসলিমা সালমা নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘শিশু অসুস্থ হলে চিকিৎসক না থাকায় আমরা বিপাকে পড়ি। চরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।’

চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বাসস’কে বলেন, ‘চরের মানুষ এখনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে। দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মতিউর রহমান বাসস’কে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন চরাঞ্চলে বাসবাসকারী মানুষের সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।