বাসস
  ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৪:৩৭
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৪:৫১

বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে অনলাইন মনিটরিংয়ের আওতায় আসছে ইটিপি ব্যবস্থা 

বুড়িগঙ্গা নদী। ফাইল ছবি

॥ বিএম নূর আলম ॥

ঢাকা, ২৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করতে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পকারখানায় ইটিপি (বর্জ্য জল শোধনাগার) ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সচল রাখতে নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এই ব্যবস্থা অনলাইন মনিটরিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. লুৎফর রহমান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, বুড়িগঙ্গায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখতে ইটিপি ব্যবস্থা অনলাইন মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেজন্য দূষণপ্রবণ এলাকায় আইপি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে সেখানে সরাসরি কন্ট্রোলরুম স্থাপন হবে। 

ইটিপি হলো এমন একটি শোধন ব্যবস্থা, যেখানে শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত তরল বর্জ্য বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন করে পরিবেশে নিঃসরণ করা হয়। অর্থাৎ, নদী বা খালে বর্জ্য ফেলার আগে সেটিকে রাসায়নিক, জৈবিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ মাত্রায় নিয়ে আসাই ইটিপির মূল কাজ।

ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, কারখানা থেকে নির্গত পানিতে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক, রঙ, তেল, ভারী ধাতু এবং ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। এই অপরিশোধিত পানি সরাসরি ড্রেন বা নদীতে গেলে পরিবেশ, জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইটিপি মূলত পরিবেশ দূষণ রোধ করতে এবং পানিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে ব্যবহার করা হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবেশ অধিদপ্তর বুড়িগঙ্গাসহ দেশের শিল্পপ্রধান ও দূষণপ্রবণ এলাকার নদীর পানির গুণগতমান নিয়মিত পরিবীক্ষণ করছে। বুড়িগঙ্গা নদীতে ৭টি পরিবীক্ষণ পয়েন্ট রয়েছে। এছাড়া নদীর পলি খনন করে নাব্যতা বৃদ্ধি ও দূষিত পলি অপসারণের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন র্কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন কাজ পরিচালনা করছে।

রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদী এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, বিভিন্ন বাসা-বাড়ির ময়লা সরাসরি নদীতে ফেলা এবং পলিথিনের কারণে  নদীর পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ও এর আশেপাশের এলাকায় অসংখ্য ডাইং ও ওয়াশিং কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানা (ডকইয়ার্ড) গড়ে উঠেছে। পরিবেশগত নিয়মনীতি না মেনে এসব অবৈধ স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে নদী দূষণ করে আসছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএফএম)-এর অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম এ বিষয়ে বাসস’কে বলেন, পানি দূষণমুক্ত করতে প্রথমেই বিভিন্ন বাসা-বাড়ির ময়লা ও বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। সুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে ময়লা ও বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে স্থানান্তর করা, নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন অপসারণে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নদীর পলি খনন করে নাব্যতা বৃদ্ধি এবং দূষিত পলি অপসারণ করা জরুরি। এছাড়া যারা বর্জ্য ও ময়লা সরাসরি নদীতে ফেলে পানি দূষিত করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার পাশের নদ-নদী ও জলাশয় দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোপূর্বে জাতীয় পরিবেশ নীতি-২০১৮ প্রণীত হয়েছে, যার মধ্যে নদ-নদী, প্লাবনভূমি, জলাভূমি ও বিভিন্ন ধরনের জলাশয়ের প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে যুগোপযোগী নীতি নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা যুগোপযোগী করে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৬৬৫ (সর্বশেষ সংশোধিত ২০১০)-এর অধীন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধিমালাটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে তা খাল-বিল ও জলাশয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। 

এছাড়াও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২০ অনুসারে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ এবং নবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ নদীর তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা, ডকইয়ার্ড ও অন্যান্য স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে নদীকে দখলমুক্ত করছে।

বিআইডব্লিউটিএ-এর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম এ বিষয়ে বাসস’কে বলেন,  বুড়িগঙ্গা নদীতে ৩০৭টি বর্জ্যরে উৎস্যমূখ চিহিৃত করা হয়েছে। এছাড়াও নদীর তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা, ডকইয়ার্ড ও অন্যান্য স্থাপনার বর্জ্য ও ময়লা সরাসরি নদীতে না ফেলার জন্য মালিকদের ইতোমধ্যেই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীতে বর্জ্যরে উৎস্যমুখ দিয়ে যাতে নদীতে বর্জ্য সরাসরি না পড়ে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি ঢাকার চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী পরিদর্শন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বুড়িগঙ্গা নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩০২ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক বুড়িগঙ্গা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নম্বর ৪৭। প্রায় ৪০০ বছর আগে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল ঢাকা শহর।