বাসস
  ২২ জুলাই ২০২৬, ১৭:২৬
আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৭:৪৮

গোপালগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা হাসিবের আম যাচ্ছে সারাদেশে

ছবি : বাসস

লিয়াকত হোসেন লিংকন

গোপালগঞ্জ, ২২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে মাত্র ২ বিঘা জমিতে দেড়শ’ আমগাছের চারা ও তিনটি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা হাসিব হাসান। শুরুতে অনেক প্রতিকূলতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার। তবে কৃষির প্রতি ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্য তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির বদৌলতে আজ তিনি গড়ে তুলেছেন ৫২ বিঘা জমিতে তার বিশাল কৃষি খামার। তার বাগানে উৎপাদিত সুস্বাদু আম এখন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার জঙ্গলমুকুন্দপুর গ্রামের আবু সাঈদ মৃধা ও হাজেরা পারভীন দম্পতির ছেলে হাসিব হাসান। ২০১৬ সালে অনার্সে পড়ার সময় বাবার দেওয়া দুই বিঘা জমিতে আমের চারা রোপণ ও গরু পালনের মধ্যদিয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চরবকজুড়ি এলাকায় মায়ের নামে গড়ে তোলেন ‘হাজেরা এগ্রো ফার্ম’।

কাশিয়ানী উপজেলা ও নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত খামারটি বর্তমানে প্রায় ৫২ বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে ৪০ বিঘা জমিতে রয়েছে বিশাল আমবাগান। বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে গরুর খামার। হাসিবের বাগানে রয়েছে আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, বারি-৪, গোপালভোগ ও ব্যানানা জাতের আম। আধুনিক পরিচর্যা ও নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন উদ্যোক্তা হাসিব।

হাসিবের বাগানের আমের স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের কাছেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে যাচ্ছে ‘হাজেরা এগ্রো ফার্মে’ উৎপাদিত আম। এ বছর এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন তিনি। এখনও গাছে বারি-৪ ও আশ্বিনা জাতের আম রয়েছে।

উৎপাদন ও বিক্রির পাশাপাশি খামারটির রয়েছে ভিন্ন আকর্ষণ। দর্শনার্থীরা চাইলে বাগানে এসে নিজেদের পছন্দমতো গাছ থেকে আম পেড়ে খেতে এবং কিনে নিতে পারেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসছেন বাগান দেখতে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ গাছের ছায়ায় বসে উপভোগ করছেন টাটকা পাকা আমের স্বাদ। কৃষি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘হাজেরা এগ্রো ফার্ম’ এখন নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ পর্যটনের এক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তরুণ উদ্যোক্তা হাসিবের এ উদ্যোগ শুধু তার সাফল্যের গল্প নয়, তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার নাম।

স্বপরিবারে ঘুরতে আসা উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের হোগলাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘হাজেরা এগ্রো ফার্মে’ এসে খুবই ভালো লাগছে। গাছ থেকে নিজের হাতে আম পেড়ে খাওয়ার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। আমগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন সুস্বাদু। 

তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখানে এসে সময় কাটানো যায়, ছবি তোলা যায় এবং পছন্দের আম সরাসরি বাগান থেকে কিনে নেওয়া যায়। নিরাপদ ও টাটকা আমের পাশাপাশি বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশও আমাদের খুব ভালো লেগেছে। সুযোগ পেলেই আমরা এখানে চলে আসি।’

খামারের কর্মচারী ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি বেশ কিছুদিন ধরে এ খামারে কাজ করছি। এখানে আমগাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ ও বাগানের অন্যান্য কাজ করি। মালিক হাসিব ভাই নিজে সবসময় খামারের কাজের খোঁজখবর নেন এবং আমাদেরও উৎসাহ দেন। এ খামারে কাজ করে আমরা যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছি, তেমনি কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতেও পারছি। বাগানে যখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আম কিনতে আসেন, তখন আমাদেরও খুব ভালো লাগে। হাসিব ভাইয়ের ব্যবহারও অনেক ভালো।’

কৃষি উদ্যোক্তা হাসিব হাসান বাসস’কে বলেন, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। ২০১৬ সালে বাবার দেওয়া মাত্র দুই বিঘা জমিতে দেড়শ’ আমগাছের চারা ও তিনটি গরু দিয়ে আমি যাত্রা শুরু করি। শুরুতে অনেক প্রতিকূলতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমার। তবে কৃষির প্রতি ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্য আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বর্তমান ৫২ বিঘা জমিজুড়ে আমার আমের বাগান ও খামার বিস্তৃত। 

তিনি বলেন, আমার মায়ের নামে গড়ে তোলা ‘হাজেরা এগ্রো ফার্মে’ নিরাপদ পদ্ধতিতে আম উৎপাদনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য বাগান ঘুরে দেখা ও গাছ থেকে আম পেরে খাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আমাদের বাগানের আম যাচ্ছে। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। ভবিষ্যতে খামারটিকে আরও আধুনিক ও সম্প্রসারণ করে নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক পর্যটনের একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলব।

কাশিয়ানী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এজাজুল করিম বলেন, ‘হাজেরা এগ্রো ফার্মে’র মতো আধুনিক ও পরিকল্পিত কৃষি উদ্যোগ আমাদের জন্য গর্ব। তরুণ উদ্যোক্তা হাসিব হাসান আম চাষের পাশাপাশি নিরাপদ কৃষি উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক পর্যটনের যে সমন্বয় করেছেন, তা প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগে একদিকে যেমন পতিত ও অনাবাদি জমির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নিরাপদ কৃষি উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তরুণরা কৃষিতে এগিয়ে এলে দেশের কৃষি অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।’