শিরোনাম

/ বেলাল রেজভী /
মাদারীপুর, ২০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পদ্মা নদীবেষ্টিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিস্তীর্ণ বালুচর একসময় ছিল প্রায় অনাবাদি। বালুময় মাটিতে অন্যান্য ফসলের আবাদ তেমন একটা না হলেও এখন সেই চরজুড়ে অধিক পরিমাণে বাদামের চাষ হচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া, উপযোগী বেলে মাটি এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় চলতি মৌসুমে বাদামের আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। ফলে একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা বালুচরই এখন চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে শিবচর উপজেলার চর জানাজাত, মাদবরেরচর, কাঁঠালবাড়ী, সন্ন্যাসীরচর, বন্দরখোলা, বহেরাতলা উত্তর, বহেরাতলা দক্ষিণ, নিলখী ও শিরুয়াইল ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফুটতেই কৃষক-কৃষাণীরা বাদাম উত্তোলন, গাছ থেকে বাদাম আলাদা করা এবং রোদে শুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনব্যাপী চলে এ কর্মযজ্ঞ। উৎপাদিত বাদাম শুকিয়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, পদ্মার চরের উর্বর বেলে মাটি বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম করা হলেও নিয়মিত পরিচর্যা ও আগাছা পরিষ্কার করার মাধ্যমে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। ফলে প্রতিবছরই চরাঞ্চলে বাদাম চাষের পরিধি বাড়ছে।

তারা আরও জানান, এক বিঘা (৩৩শতাংশ) জমিতে বাদাম চাষ করতে খরচ হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত বাদাম উৎপাদন হয়। প্রতি মণ বাদাম সাড়ে ৫ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজারদরে বিক্রি হয়।
চর জানাজাত এলাকার কৃষক রহিম শেখ বলেন, ‘গত বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বাদামের ফলন তেমন ভালো হয়নি। তবে এ বছর অধিক ফলন হয়েছে।’
বন্দরখোলা এলাকার কৃষক রুবেল খান বলেন, এক সময় চরের এসব জমিতে তেমন কোনো ফসল হতো না। এখন বাদাম চাষ করে কৃষকরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। বাজারে দামও ভালো, তাই সবাই খুশি।
আরেক কৃষক হালিম মোল্লা বলেন, ‘চলতি মৌসুমে প্রতি মণ বাদাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা খুবই খুশি।’
কৃষাণী শিখা বেগম বলেন, চরাঞ্চলে কৃষিকাজ ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই। আগে বালুর কারণে অন্য কোনো ফসল ফলাতে পারতাম না। এখন সেই বালুচরই আমাদের আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। বালুময় জমিতে বাদামের ফলন বেশ ভালো হয়। আর ভালো লাভ হওয়াতে ছেলে মেয়ের পড়ালোখার খরচ মিটিয়ে সংসার মোটামুটি ভালোই চলছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শিবচর উপজেলায় প্রায় ৬৯০ হেক্টর জমিতে বাদামের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চর জানাজাত ইউনিয়নেই ১২০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কেজি বাদাম উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ বাদাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ব্যবসায়ীরা সরাসরি চরাঞ্চলে এসে বাদাম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান বাসস’কে বলেন, ‘শিবচরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের অনেক জমি একসময় অনাবাদি পড়ে থাকত। কৃষকরা সেই জমিতে বাদাম চাষ শুরু করে সফলতা পেয়েছেন। বর্তমানে অনাবাদি জমি উৎপাদনের আওতায় এসেছে এবং বাদাম চাষ লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। বাজারে প্রতি মণ বাদাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলের মাটি ও পরিবেশ বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে বাদামের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও কৃষি সহায়তা আরও জোরদার করা হলে শিবচরের এই বিস্তীর্ণ বালুচর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাদাম উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক অবদান রাখবে এ খাত।