বাসস
  ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৪
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭:২৮

রংপুরে চাহিদার তুলনায় ৪ গুণ শাক-সবজি উৎপাদন

জেলার মিঠাপুকুরে শাক-সবজিতে ভরা মাঠে কাজ করছেন কৃষক। । ছবি: বাসস

/রেজাউল করিম মানিক/

রংপুর, ২০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : রংপুরে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪ গুণ শাক-সবজি উৎপাদন হচ্ছে। তাই মৌসুমে সরবরাহ বেশি থাকায় ফসলের দাম পাচ্ছে না কৃষক। প্রায় এক যুগ ধরে সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি করা হলেও তা প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অপরদিকে সার, সেচ, কীটনাশকসহ সকল উপকরণের দাম বাড়ায় ফসল উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে। তাই ফসল সংরক্ষণের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতসহ কৃষকের জীবন-জীবিকা রক্ষায় জোরালো দাবি উঠেছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকের স্বার্থে রংপুরে প্রাথমিকভাবে মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর জেলার সবজি উৎপাদনের শীর্ষ উপজেলা মিঠাপুকুর। এ উপজেলায় বরবটি, করলা, কাকরোল, পটল, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শসা, কচু, কাঁচামরিচ, লালশাক, পুঁইশাক, ডাটা শাক, কলমি শাকসহ প্রায় ২০ প্রকার শাক-সবজিতে ভরে গেছে কৃষকের মাঠ। তীব্র তাপদাহকে উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন কৃষক। কেউ ঘাস নিড়ানী, কেউ ফসল উত্তোলন, কেউ জৈব বালাইনাশাক প্রয়োগ আবার কেউবা নতুন করে শাক-সবজি উৎপাদনে জমি চাষ করছেন।

রানীপুকুর ইউনিয়নের সদর এলাকার রমজান আলী ২০ শতক জমিতে কাকরোল আবাদ করেছেন। ক্ষেতের আগাছাগুলো পরিস্কার করতে করতে তিনি বলেন, ‘মৌসুমোত সবার কাঁচামাল একসাতে বাজারোত আইসে। সেই সময় ১০টাকার মাল ৫-৬ টাকায় বিক্রি হয়। কাকরোল এ্যালা ১০ টাকা থ্যাকি ১৫ টাকা কেজি বিক্রি করা নাগতোছে। স্টোর থাকলে ওটে রাখি একনা দেরি করি বেচা গেইলে ৪০ টাকা কেজি করি বেচবার পানু হয়। সরকার গ্রামে গ্রামে স্টোর দিলে হামার জন্তে ভাল হইল হয়।’

অপর কৃষক রাজু মিয়া বলেন,‘ হামরা ফেরোমন ট্রাপ দিয়া আবাদ করছি। কীটনাশক কম দেই, গোবর সার বেশি দিছি। এইবার ফলন ভাল হইছে। এই সিজেনোত পটল, কাকরোল, করলা, বরবটি সবারে বাজারোত উঠতোছে। কিন্তু বাজারোত মালের দাম নাই। স্টোর থাকলে অফ সিজনোত সবজি বিক্রি করবার পানু হয়। দামও বেশি হইল হয়। এ্যালা তো সার, পানি সউগ কিচুর দাম বেশি। সবায় ভোটের আগোত স্টোর করি দিবার চায়। ভোট শ্যাষ, ওমার কতাও শ্যাষ।’

কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, আমি লাউয়ের আবাদ করি ক্ষেত থেকে প্রতি পিস ১৫-২০ টাকা দরে বিক্রি করছি। কিন্তু এটা সংরক্ষণ করা গেলে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা যেত। আমরা যদি ফসলের ন্যায্য মূল্য বা ভালো দাম পাই তাহলে উৎপাদনে আগ্রহ বাড়বে। আর রংপুরের উৎপাদিত ফসল কৃষকরা যদি নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে রেলপথে সরাসরি ঢাকা চট্টগ্রামে পাঠাতে পারতো, তাহলে বেশি লাভবান হতো। এছাড়া যেহেতু গ্রামে কীটনাশক কম ব্যবহার করে, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে শাক-সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই সরকার উদ্যোগী হলে তা বিদেশে রপ্তানী করা সম্ভব হবে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রংপুর জেলায় ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে রবি মৌসুমে ১৭ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে শাক-সবজির আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ মেট্রিক টন। খরিপ-১ মৌসুমে ১১ হাজার ৪’শ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ১২ হাজার ৯’শ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টন। চলতি খরিপ-২ মৌসুমে ৬ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে শাক-সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও এখন পর্যন্ত ২ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে শাক-সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন। রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২ মৌসুম মিলে রংপুর জেলায় ৩৫ হাজার ৫৪০ হেক্টরের বেশি জমিতে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টন শাক-সবজি উৎপাদন হবে। এর বিপরীতে জেলার চাহিদা মাত্র ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। অর্থ্যাৎ স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৪ গুণ শাক-সবজি উৎপাদন হচ্ছে রংপুর জেলায়। 

বিভিন্ন সময়ে রংপুর জেলায় শাক-সবজি সংরক্ষণে একাধিক সংরক্ষণাগার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি কেউ। ফলে বছরের পর বছর কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই কৃষকরা বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত শাক-সবজি সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন। এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সম্প্রতি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা, সদর ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ৭টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি কন্টেইনার এবং রুম বেইজে করা হচ্ছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, যেসব মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা হচ্ছে এর সফলতার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে সারাদেশে ২ হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করা হবে। এতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শাক-সবজি সেখানে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে রাখতে পারবেন। এছাড়া রংপুরে উৎপাদিত শাক-সবজি বিষমুক্ত করতে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এটিকে সহজলভ্য করতে প্রতিটি কীটনাশকের দোকানে বাধ্যতামূলকভাবে জৈব বালাইনাশাক রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উত্তম কৃষি চর্চা ছড়িয়ে রংপুরের উৎপাদিত শাক-সবজি দেশ-বিদেশে রপ্তানীতে কাজ করা হচ্ছে।