শিরোনাম

/মহিউদ্দিন সুমন/
টাঙ্গাইল, ২০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ক্যান্সারে আক্রান্ত মা লাভলী বেগমকে ফরমালিন মুক্ত নিরাপদ আনার খাওয়াতে পরামর্শ দেন চিকিৎসক। এরই ধারাবাহিকতায় মাকে নিয়মিত ফরমালিন মুক্ত আনার খাওয়াতে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে শখের বসে নিজ বাসার ছাদে কয়েকটি আনার গাছ রোপণ করেন আলামিন। ধীরে ধীরে আনার বাগানটি পরিণত হয় সফল একটি ছাদ বাগানে। মা লাভলী বেগম ২০২৫ সালের মে মাসে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। আলামিন তার নিজের গাছের নিরাপদ আনার মাকে খাওয়াতে না পারলেও ছাদ বাগানে আনার চাষ করে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন আলামিন।
টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় আধুনিক পদ্ধতিতে আনার চাষ ও কলমের মাধ্যমে করা আনার চারা বিক্রি করে আলামিন শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাচ্ছেন না, স্থানীয় অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন তিনি।
বর্তমানে আলামিনের ছাদ বাগানে প্লাস্টিকের ড্রামে ভারতের মহারাষ্ট্রের সুপার ভাগোয়া, মৃদুলা, গুজরাটি আনার, থাইল্যান্ডের থাই আনার, অস্ট্রেলিয়ার বিগ থাই, রিমন, মেক্সিকান, মৃদুলা, পাকিস্তানি আনারসহ মোট ২৬ জাতের মোট ৬০টি বড় আনার গাছ রয়েছে। বছরে দুইবার বর্ষা ও শীত মৌসুমে পরিপক্ক আনারের ফলন পাচ্ছে আলামিন। আনার ও কলমের চারা বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে তার আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
সরেজিমনে জেলার বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামে তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিনের ছাদ বাগান ঘুরে দেখা যায়, গোলাপি-লালচে আনারে নুয়ে পড়েছে গাছের ডাল। কোথাও কোথাও পাকা ফলের ভার। আবার কোনো কোনো গাছের ডালে ফুটে আছে টকটকে লাল ফুল। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুঁলে থাকা আনার আর লাল ফুলের মেলবন্ধনে পুরো বাড়ির ছাদজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। প্রকৃতি যেন নিজে হাতে এঁকেছে রঙিন এক ক্যানভাস। প্রত্যেক গাছে ২৫ থেকে ৩০টি করে আনার শোভা পাচ্ছে। ফলে ছাদ বাগানটি এখন লাল-সবুজের অপরূপ সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে। এর সাথে দেখা গেল তরুণ উদ্যোক্তা আলামিনের চোখে মুখে ফুটে ওঠা তৃপ্তির হাসি। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চিলতে বিষাদ আর মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর গভীর টান।
স্থানীয়রা জানান, আলামিনের সফলতা দেখে অনেকেই এখন আনার ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন নতুন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে আনার চাষেরও প্রসার ঘটছে।
স্থানীয় মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলাপকালে বাসস’কে বলেন, মাল্টা, কমলা, ড্রাগনসহ বেশকিছু ফলের চাষ আমি করছি। তবে আনার চাষে কখনো আলোর মুখ দেখতে পারিনি।
তিনি বলেন, তার মা যখন অসুস্থ, তখন থেকেই বাসার ছাদে আনার বাগান করা শুরু করে। দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে তার কাছে থেকে কলমের চারা নিয়ে বাগান করছে। আমারও ইচ্ছে আছে আলামিনের কাছ থেকে চারা নিয়ে তার মতো ছাদে বাগান করার।
আল আমিনের বাগান দেখতে আসা কলেজ ছাত্রী তানিয়া আক্তার বাসস’কে বলেন, বাসার ছাদে চমৎকার একটি ছাদ বাগান দেখলাম। দেশের মাটিতে ও বাসার ছাদে এতো সুন্দর আনার চাষ করা যায়, তা আমার জানা ছিল না। আমি খুব দ্রুত তরুণ উদ্যোক্তা আলামিনের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আমার বাসার ছাদে আনার বাগান করবো।
তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিন বাসস’কে বলেন, ২০২৩ সালের সময়টা ছিল আমার জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ। এ সময় আমার মা লাভলী বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তখন আমি গার্মেন্টসে চাকরি করি। মাকে চিকিৎসক আনার ফল খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। বাজার থেকে কেনা আনারে কেমিক্যাল থাকায় সেটা তো নিরাপদ না। ওই সময় বাজারে আনার ফল ক্রয় করতে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা লাগতো।
তিনি বলেন, এত টাকা দিয়ে আনার ক্রয় করা আমার জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। মাকে ভালো আনার ফল খাওয়ানোর জন্য প্রথমে বাড়ির উঠানে আনার চারা রোপণ করি তখন।
পরে ইউটিউবে ছাদে আনার বাগান করার ভিডিও দেখে বাগান করার সিদ্ধান্ত নেই। পরবর্তীতে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে কয়েকটি ছোট আনার চারা ক্রয় করে ছাদে ড্রামের মধ্যে রোপণ করি। যখন মায়ের শরীর বেশ ভালোর দিকে, তখন আমি চাকরি ছেড়ে আনার চাষে আরো মনোযোগ দেই।
তিনি আরও বলেন, প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতের আনার সংগ্রহ করে সে। নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ ও সময়মতো সেচ দেওয়ার ফলে এবারও আনারের ভালো ফলন পায়।
আলামিন চাকরি বাদ দেওয়ার এক সপ্তাহ পর ২০২৫ সালের মে মাসে তার মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের জন্যই আনার বাগান গড়ে তুলে ছিল সে। মা ছিল আলামিনের জন্য অনুপ্রেরণা। মায়ের মৃত্যুর পর আলামিন দমে যায়নি। ধাপে ধাপে বাগানের পরিধি বাড়িয়েছে।
আলামিন আরও জানান, তার নিজ হাতের কলম করা চারা এখম দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ছাদ বাগানে চলে যাচ্ছে। আগামীতে আরও বৃহৎ পরিসরে আনার চাষের পরিকল্পনা রয়েছে আলামিনের। যারা ছাদ বাগান করছেন, তাদের কাছে এই আনার চারা পৌঁছে দেওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।
তিনি বলেন, আমার বাসার ছাদ ও মাটিতে এখন প্রায় দুই হাজার আনার চারা রয়েছে। সর্বনিম্ন ২শ’ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা মূল্যের চারাও বিক্রি করেছি। আমার ছাদে ড্রামের ৬০ আনার গাছে প্রচুর ফল ধরে আছে। এর পাশাপাশি ছাদে আঙ্গুর, কমলা ও মাল্টাও হয়েছে। আনার ও কলমের চারা বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে আমার আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। আনার ও চারা আমার ফেসবুক পেইজের মাধ্যমেও বিক্রি করে থাকি।
তিনি আরো জানান, ছাদ বাগানে সে নিজেই কাজ করে। যখন দরকার হয় তখন এ কাজে শ্রমিক নিয়োজিত করে। এছাড়া এখান থেকে যারা আনার চারা ক্রয় করেন, তাদেরকে ছাদ বাগান করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
বাসাইল উপজেলা উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু ইলিয়াস তালুকদার বাসস’কে বলেন, উপজেলার সফল তরুণ উদ্যোক্তা আলামিন। সে তার বাসার ছাদে আনার বাগান করেছে। ছাদে আনার বাগান ও চারা কলম করে বিক্রি করছে। তার বাগানের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। প্রতি মাসে ভালো আয় করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আলামিনকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, কৃষিতে সফল হওয়া যুবক আলামিনের গল্প প্রমাণ করে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, পরিশ্রম ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশেই গড়ে তোলা সম্ভব লাভজনক উদ্যোগ। তার এই সফলতা অন্য তরুণদেরও কৃষিমুখী হতে নতুন করে উৎসাহ জোগাচ্ছে। তার বাগান দেখে অনেক তরুণ ছাদে আনার বাগান করতে উৎসাহী হচ্ছে।