শিরোনাম

॥ দিলরুবা খাতুন ॥
মেহেরপুর, ১ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : জেলা শহরের হঠাৎ পাড়ার একটি বাড়ির আঙিনায় দাঁড়ালেই কানে আসে এক ঝাঁক পাখির কিচির মিচির। মাথা তুলে তাকাতেই চোখ আটকে যায় একটি উঁচু নারকেল গাছে। বাতাসে দুলছে একের পর এক ঝুলন্ত বাসা। যেন কোনো শিল্পী রাতভর বসে নিখুঁত হাতে বুনে রেখেছেন খড় আর ঘাসের অদ্ভুত সব শিল্পকর্ম। কিন্তু এই শিল্পী কোনো মানুষ নয়, বাবুই পাখি।
যে বাবুই পাখিকে একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি তাল, খেজুর কিংবা সুপারি গাছে দেখা যেত, সেই পাখিই আজ বিলুপ্তির পথে। পনেরো-বিশ বছর আগেও বিকেলের মাঠে হাঁটতে বেরোলে চোখে পড়ত সারি সারি ঝুলন্ত বাসা। এখন সেই দৃশ্য যেন স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। পরিবেশের পরিবর্তন, নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাভূমি হারিয়ে যাওয়া, খাদ্যের সংকট এবং কীটনাশকের প্রভাবে বাবুইয়েরা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের চোখের আড়ালে।
তাই মেহেরপুর শহরের এই নারকেল গাছটি এখন কেবল একটি গাছ নয়, প্রকৃতির ফিরে আসার এক নীরব ঘোষণা। প্রায় এক বছর ধরে এখানে বাসা বুনে বসবাস করছে বাবুই পাখির একটি দল। নতুন বাসা তৈরি হচ্ছে, পুরোনো বাসায় ছানা বড় হচ্ছে, আর সারাদিন গাছজুড়ে চলছে তাদের ব্যস্ত সংসার।
স্থানীয় বাসিন্দা খুশবু আক্তার বাসস’কে জানান, শুরুতে কয়েকটি বাসা ছিল। ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এখন গাছটি যেন বাবুই পাখির একটি ছোট্ট আবাসন। প্রতিদিন মানুষ দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রাখেন। শিশুদের কাছে এটি বিস্ময়, আর প্রবীণদের কাছে ফিরে পাওয়া শৈশব।
পাখি প্রেমীদের মতে, বাবুই পাখি এমন জায়গাই বেছে নেয়, যেখানে নিরাপত্তা আছে। খাদ্যের ব্যবস্থা আছে এবং মানুষ তাদের বিরক্ত করে না। তাই এই গাছটি প্রমাণ করে, প্রকৃতিকে একটু জায়গা করে দিলে প্রকৃতি নিজেই ফিরে আসতে জানে।
একটি নারকেল গাছ, কয়েক ডজন ঝুলন্ত বাসা আর অসংখ্য ছোট ছোট পাখির ডানার শব্দ-মেহেরপুর শহরের হঠাৎ পাড়া আজ যেন সেই হারিয়ে যাওয়া বাংলার গল্পই নতুন করে শোনাচ্ছে। যে গল্পে আছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীব বৈচিত্র্যের আবেদন এবং মানুষ ও পাখির সহাবস্থানের এক নীরব প্রত্যাশা।
পথচারী আবদুল ওয়াহেদ বলেন, এমন সুন্দর পাখির বাসা সেই ছোট্ট বেলায় দেখেছি। এতদিন পরে নারকেল গাছে বাবুই পাখির এই বাসা দেখে মনে হচ্ছে প্রকৃতি তার নিজের জায়গায় ফিরছে।
পাখি বিশেষজ্ঞ সদানন্দ মন্ডল জানান, বাবুই পাখি শান্ত, নিরিবিলি ও নিরাপদ পরিবেশ পছন্দ করে। তাল, খেজুর, সুপারি ও নারকেল গাছ তাদের বাসা তৈরির জন্য আদর্শ। বাসা তৈরিতে তারা ব্যবহার করে ঘাসের আঁশ, পাট জাতীয় তন্তু ও বিভিন্ন উদ্ভিদের সরু পাতা। অনুকূল পরিবেশের অভাবে বাবুই হারাবার পথে।