বাসস
  ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৪২
আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১১:১৯

এইচএসসিতে মোট পরীক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি মানবিকে, এগিয়ে মেয়েরা

প্রতীকী ছবি

॥ নাজিউর রহমান সোহেল ॥

ঢাকা, ০১ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : সারা দেশে আগামী ২ জুলাই থেকে একযোগে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় এবারও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রদের চেয়ে প্রায় ২৬ হাজার বেশি ছাত্রী অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি মানবিক বিভাগের, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বোর্ডভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে এবার ৯টি শিক্ষা বোর্ডে ‘একক ও অভিন্ন’ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষা নকলমুক্ত ও স্বচ্ছ পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করাসহ সংশ্লিষ্টদের ‘একগুচ্ছ’ নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

আন্তঃবোর্ড সমন্বয় কমিটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় বসছে। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ ছাত্রদের চেয়ে ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। গত বছর ছাত্র সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫জন এবং ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬জন।

তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ পরীক্ষায় অংশ নেবেন।

আন্ত:শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির চিত্র অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে ছাত্রদের অংশগ্রহণ কেন কিছুটা কমেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। বিগত সময়ে শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিতে যে ঘাটতি (টিচিং-লার্নিং গ্যাপ) ছিল, তার কারণে এমনটি হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষার্থীর চিত্র:
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪০৬ জন এবং ছাত্রী ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩০৮ জন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বোর্ড।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বোর্ডের মোট পরীক্ষার্থী ৩ লাখ ৩৯৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৭; ছাত্রী ১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬। রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৭৩ হাজার ৫৭; ছাত্রী ৬৭ হাজার ৭৭৩। যশোর বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৫৭ হাজার ৫জন; ছাত্রী ৬০ হাজার ২০৫। দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৫৪ হাজার ৪৩৬; ছাত্রী ৫৯ হাজার ৪৩ জন।

আর চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৪৩ হাজার ১৮২; ছাত্রী ৫৬ হাজার ৫০৬। কুমিল্লা বোর্ডে ৯৪ হাজার ৮০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৩৭ হাজার ৬০৬; ছাত্রী ৫৭ হাজার ১৯৬। ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭৩ হাজার ৩৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৩৪ হাজার ৩১৩; ছাত্রী ৩৮ হাজার ৭২৪জন। সিলেট বোর্ডে ৭১ হাজার ৬১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২৮ হাজার ৫৪৫; ছাত্রী ৪৩ হাজার ৬৬ জন। অন্যদিকে বরিশাল বোর্ডে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২৬ হাজার ৯০৫; ছাত্রী ৩১ হাজার ৭৫৯ জন।

মোট পরীক্ষার্থীর অর্ধেক মানবিকে :
গ্রুপভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মোট ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ মানবিক বিভাগের। এই শাখায় মোট পরীক্ষার্থী ৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৭ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর অর্ধেকরও বেশি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বাসস’কে বলেন, মানবিকে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে দ্রুত শিক্ষাস্তর সমাপ্তি করার প্রবণতা এবং কর্মে প্রবেশ করার কারণে হতে পারে। পাশাপাশি বিজ্ঞানে শিক্ষার্থী কমার পেছনে প্রান্তিক পর্যায়ের কলেজগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে ভীতি, শিক্ষক সংকট এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা না থাকার বিষয় অন্যতম কারণ হতে পারে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবছর মানবিক বিভাগ থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র ২ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯; ছাত্রী ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩জন। আর বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৩৭জন। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪২; ছাত্রী ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৫ জন। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এবছর ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র  ৯২ হাজার ৩৭২; আর ছাত্রী ৭৭ হাজার ৩১১ জন।

এদিকে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি সমমানের মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে একই দিনে।

পরিসংখ্যান মতে, মাদ্রাসা বোর্ডে আলিম পরীক্ষায় মোট ৯২ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৫২ হাজার ১১ এবং ছাত্রী ৪০ হাজার ৮৯৪ জন। মোট ৪৬১টি কেন্দ্রে ২ হাজার ৭০৫টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসবেন। মাদ্রাসার বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে মানবিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৪ হাজার ৬১৬জন; বিজ্ঞানে ৭ হাজার ৬২৬জন এবং মুজাব্বিদ বিভাগে অংশ নেবে ৬৬৩জন।

অন্যদিকে কারিগরি বোর্ডে ১ হাজার ৩৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী ৬১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ছাত্র ৭৭ হাজার ৫৫২ এবং ছাত্রী ৩০ হাজার ৪১২ জন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট প্রকৌশলী মো. মনজুরুল কবির বাসস’কে বলেন, আগে এইচএসসিতে ব্যবসায় শিক্ষায় ভর্তির হার বেশি থাকলেও এবার মানবিকে পরীক্ষার্থী বেশি।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা এবং বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছেন।

নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর চিত্র :
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত নিবন্ধিত (সেশন ২০২৪-২৫) শিক্ষার্থীর সংখ্যাই সিংহভাগ, যা প্রায় ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। অন্যদিকে, বিগত বছরগুলোতে অকৃতকার্য হওয়া বা আংশিক বিষয়ে ফেল করা অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৯৫ হাজার ১০৬ এবং দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৪ হাজার ৬৭০জন। এছাড়া মানোন্নয়ন (ইমপ্রুভমেন্ট) পরীক্ষার জন্য আবেদন করেছেন ৬ হাজার ৭৪০ জন শিক্ষার্থী।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বাসস’কে বলেন, এবছর থেকে ৯টি সাধারণ বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয় ও কমন বিষয়গুলোও একক বা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

প্রশ্নপত্র সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা :
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, ২ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষা সুষ্ঠু, নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ডগুলো সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

আন্ত:শিক্ষা বোর্ড সভাপতি বাসস’কে বলেন, বোর্ডভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে এ বছর থেকে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ‘একক ও অভিন্ন’ প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এজন্য আমরা প্রশ্নপত্র বিতরণ ও সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক ব্যবস্থা নিয়েছি।

নির্দেশনামতে, প্রশ্নপত্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগে সংশ্লিষ্ট ট্রেজারি অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে থানা বা ট্রেজারির লকারে রক্ষিত প্রশ্নপত্রের প্যাকেট বিবরণী তালিকার সাথে নিখুঁতভাবে যাচাই করতে হবে। পরীক্ষার দিনগুলোতে ট্রেজারি থেকে ২ সেট সৃজনশীল (সিকিউ) এবং ১ সেট বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) প্রশ্নের সিকিউরিটি খাম ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ প্রহরায় কেন্দ্রে আনতে হবে। মোবাইল ফোনে সেট কোডের এসএমএস পাওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ কর্মকর্তাকে তা প্রদর্শন করে নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল প্রশ্নপত্রের ফয়েল প্যাকেট খুলতে হবে।