বাসস
  ২৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯

গবাদিপশুর রোগবালাই সুরক্ষায় বেসরকারিভাবে ৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ

॥ কবির আহমেদ খান ॥

ঢাকা, ২৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : গবাদিপশুর রোগবালাই সুরক্ষায় ভ্যাকসিন আমদানির বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) এবং ফুট এন্ড মাউথ ডিজিস (এফএমডি) রোগের জন্য প্রায় ২ (দুই) কোটি করে ৪ (চার) কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বেসরকারিভাবে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পাশাপাশি দেশেও ভ্যাকসিনের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। গত বছর যেখানে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ, এবার তা বাড়িয়ে ২০ লাখ করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান বাসসকে বলেন, মূলত ফুট এন্ড মাউথ ডিজিস (এফএমডি) এবং এলএসডি রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে এলএসডি রোগের জন্য প্রায় দুই কোটি এবং এফএমডির জন্য দুই কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বেসরকারিভাবে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়িয়ে ২০ লাখ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের চাহিদা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ঘাটতি মোকাবেলায় চাহিদা অনুপাতে তারা এই ভ্যাকসিন আমদানি করবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে সরবরাহকৃত ভ্যাকসিনের পরিমাণ পর্যাপ্ত না থাকায় ২ কোটি ডোজ ট্রাইভ্যালিন এফএমডি ভ্যাকসিন এবং ২ কোটি ডোজ এলএসডি ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এছাড়া বাণিজ্যিক মুরগী উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেলোপ্যাথোজনিক একটি প্রাণঘাতী রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে খামারিদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তাই বাণিজ্যিক মুরগীতে লোপ্যাথোজনিক প্রতিরোধে এইচ৯এন২ এর বিভিন্ন কম্বিনেশন ভ্যাকসিন আমদানি করা হবে। বাজারে এই ভ্যাকসিনের ঘাটতি থাকার কারণে ৫০ কোটি ডোজ এইচ৯এন২ এবং এর বিভিন্ন কম্বিনেশন ভ্যাকসিন আমদানির বিষয়ে অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দুনিয়াজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর  উষ্ণায়ন বাড়ছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশা, মাছি এবং এঁটুলির বংশবৃদ্ধি ও তৎপরতা অনেক বেড়েছে, এর ফলে গবাদি পশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) এবং ক্ষুরা রোগ বা এফএমডি এর মতো ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব সংক্রামক রোগের হাত থেকে দেশের প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতকে রক্ষা করতে চলতি বছরে বড় পরিসরে ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. তারেক হোসেন বাসসকে বলেন, গরমের কারণে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।  প্রাণীরক্ষায় এফএমডি (ক্ষুরারোগ) ও এলএসডি গবাদিপশুর গুরুত্বপূর্ণ রোগ। এ রোগ ২টির কারণে খামারিদের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি হয়।

তিনি এলএসডি ও এফএমডি রোগ সম্পর্কে জানান, এলএসডি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত গরু, মহিষ ও ছাগলকে আক্রান্ত করে। মশা-মাছি, মুখের লালা ও খামারে অব্যবস্থাপনার কারণে এ রোগ ছড়ায়। এ রোগে প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রিতে  পর্যন্ত হয়ে থাকে। গরু খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। শরীরে খুবই ব্যথা হয়। তার দুদিন পর গরুর শরীরের বসন্তের মতো গুটি গুটি চাকা দেখা দেয়। পরে সেখান থেকে পুঁজ জমে ফেটে মাংস খসে পড়ে। এতে গরুর প্রজনন কমে যায়, গরুর ওজন ও দুধ উৎপাদনও কমে যায়।

তারেক হোসেন আরও বলেন, জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস এলএসডির জন্য পিক টাইম। এ রোগে গবাদিপশুর মৃতের হার ১০ শতাংশ। সময়মত চিকিৎসা না করালে পশু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়।

প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯২৯ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়ায় প্রথম এ রোগ শনাক্ত হয়। পরে ধীরে ধীরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে লাম্পি স্কিন ডিজিজ শনাক্ত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগটি বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এটিকে গবাদিপশু খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।