বাসস
  ২৮ জুন ২০২৬, ১৮:৩০

কৃষিকে পেশা করে সফল উদ্যোক্তা বাউফলের মেহেদী হাসান

ছবি : বাসস

 এনামুল হক এনা

পটুয়াখালী, ২৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : জেলার বাউফল উপজেলার মেহেদী হাসান (৩০) একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে স্থানীয় মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। তার গড়ে তোলা নার্সারি ও আমবাগানে এ বছর বিভিন্ন জাতের আমের অধিক ফলন হয়েছে। 

এ বাগানের আম দিয়ে তিনি নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও আপ্যায়ন করছেন। উদ্বৃত্ত আম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাজারজাত করে ভালো আয় করছেন। কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, এলাকায় সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছেন।  

সরেজমিনে উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মেহেদী হাসানের আমবাগান ও নার্সারি ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা আমের থোকা। পরিচর্যার কারণে প্রতিটি গাছই বেশ স্বাস্থ্যবান। 

বাসসে’র সঙ্গে আলাপকালে মেহেদী হাসান বলেন, তিনি বাউফল সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চাকরির চেষ্টা করেন। কিন্তু চাকরি পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়েন। তাই তিনি চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তার এ সিদ্ধান্তকে পরিবারের সদস্যরাও সমর্থন করেন। তার বাবা একজন কৃষক ছিলেন। ফলে কৃষিকাজ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই কিছুটা ধারণা ছিল, যা এ পেশায় মনস্থির করতে সাহস জুগিয়েছে।

মেহেদী জানান, কৃষি খাতে যাত্রার শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম দুই বছর তাকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। লোকসানও গুনতে হয়েছে কয়েকবার। তবে হাল না ছেড়ে তিনি নার্সারিতে দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছের চারা উৎপাদন শুরু করেন। পাশাপাশি মাছ চাষেও মনোযোগ দেন। ধীরে ধীরে তার পরিশ্রমের ফল মিলতে শুরু করে। বর্তমানে তার মাসিক আয় এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে। কৃষিকাজের মাধ্যমে তিনি এখন স্বাবলম্বী জীবনযাপন করছেন।

তার নার্সারি ও আমবাগানে বর্তমানে দুইজন স্থায়ী দিনমজুর কাজ করেন। এছাড়া কৃষি মৌসুমে আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেয়া হয়। এতে স্থানীয় অনেক পরিবারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মেহেদী মনে করেন, কৃষি শুধু ব্যক্তিগত আয়ের উৎস নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করারও একটি কার্যকর মাধ্যম।

মেহেদীর বাগানে বিভিন্ন জাতের আমের সমাহার রয়েছে। এর মধ্যে আম্রপালি, বারি-৪, বারি-১১, গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা, কাটিমন, মল্লিকা, হারিভাঙ্গা, ব্যানানা ম্যাংগো ও থাই জাতের আম উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সময় পাকার কারণে এসব আম দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ফলে তিনি ভালো দামও পান। 

স্থানীয় বাজারে তার বাগানের উৎপাদিত আমের কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম বিক্রি করেছেন এবং বাগানে এখনও ৫০ থেকে ৬০ মণ আম রয়েছে বলে জানান তিনি। মৌসুম শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব আম বিক্রি করে আরও ভালো আয় হবে বলে আশা করছেন।

তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পাশাপাশি নিজের বাগানের ফল আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। প্রতিবেশীদেরও নিয়মিত উপহার হিসেবে আম দেন। এতে সামাজিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয় এবং মানুষ দেশীয় ফল চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তার মতে, কৃষির প্রকৃত আনন্দ শুধু লাভে নয়, নিজের উৎপাদিত ফল অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করাতেও রয়েছে।

মেহেদী জানান, জেলা কৃষি অফিস ও বাউফল উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তিনি নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা পান। সার, বীজ ও রোগবালাই দমন বিষয়ে পরামর্শ এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ তাকে আরও দক্ষ করে তুলেছে। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

মদনপুরা গ্রামের বাসিন্দা আলতাফ ব্যাপারী (৫৫) বাসস’কে বলেন, মেহেদীকে ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ছেলে হিসেবে চিনি। চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে সে যে সফলতা অর্জন করেছে। তিনি আমাদের গ্রামের জন্য গর্বের বিষয়। তার বাগান ও নার্সারি দেখে অনেকেই এখন কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন।

মদনপুরা গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মৃধা (৪৫) বলেন, মেহেদী আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে ভালো ফলন পাচ্ছে। নিয়মিত পরিচর্যা ও কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুসরণ করে সে যে সফল হয়েছে, তা এলাকার তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই নতুন করে ফল চাষ শুরু করেছেন।

মদনপুরা ইউনিয়নের ইমরান হোসেন (৩০) বলেন, মেহেদীর সফলতা আমাকে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার পরামর্শে আমি বাণিজ্যিকভাবে মরিচ চাষ শুরু করেছি। এখন ভালো ফলন পাচ্ছি এবং আগের তুলনায় আয়ও বেড়েছে। তরুণদের জন্য তিনি একজন অনুকরণীয় উদ্যোক্তা।

বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বাসস’কে বলেন, মেহেদী হাসান একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি নার্সারিতে বিভিন্ন দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় ১০০ টি আমগাছের একটি বাগান গড়ে তুলেছেন। 

তিনি বলেন, গত বছরের মতো এবারও তিনি আম উৎপাদনে সফল হয়েছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও পরামর্শমূলক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তার এই সাফল্য এলাকার অন্যান্য কৃষকের জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ।