বাসস
  ২৬ জুন ২০২৬, ১১:০২

মাদক নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাফল্য: স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে আসক্তরা

ছবি : সংগৃহীত

মহসিন বেপারী

ঢাকা, ২৬ জুন, ২০২৬ (বাসস) : মাদক নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে আসক্তরা। এসব কেন্দ্র চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজারো মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মাদকাসক্তি বর্তমানে একটি বড় সামাজিক সমস্যা। যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের ভয়াবহ ছোবলে আক্রান্ত হয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র।

তাদের মতে, মাদকাসক্তি কেবল একটি অপরাধ বা বদভ্যাস নয়; এটি একটি জটিল স্বাস্থ্যগত ও মানসিক সমস্যা। ফলে এর চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসন।

বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত ডিটক্সিফিকেশন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, ব্যক্তিগত ও গ্রুপ কাউন্সেলিং, আচরণগত থেরাপি, পারিবারিক কাউন্সেলিং এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক আসক্ত ব্যক্তি নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছেন।

রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘ঘরে ফেরা’ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া সাব্বির হোসেন জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ইয়াবা ও গাঁজার নেশায় আসক্ত ছিলেন তিনি। পরিবার ও কর্মজীবন প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। পরে পরিবারের উদ্যোগে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত চাকরি করছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

এ ধরনের সফলতার গল্প এখন অনেক কেন্দ্রেই দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগীর আন্তরিকতা ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে সুস্থতার হার অনেক বেড়ে যায়।

রাজধানীর উত্তরার আমার হোম মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সিইও নাঈম আহমেদ বলেন, ‘আমরা যে আসক্তিগুলোর চিকিৎসা করি, তার মধ্যে ইয়াবা সবচেয়ে সাধারণ। আমাদের বর্তমান ভর্তিকৃতদের প্রায় ৪৫ শতাংশ ইয়াবা আসক্তিতে ভুগছেন। দুর্ভাগ্যবশত, উত্তরা এবং উত্তর ঢাকা করিডোরে ইয়াবার সহজলভ্যতা ব্যাপক, বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ কর্মজীবী পুরুষদের মধ্যে। ইয়াবা ছাড়ার সময় তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, ঘুমের ব্যাঘাত, বিষণ্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহপ্রবণতা বা আগ্রাসন দেখা দেয়। এটি নিরাপদে সামলানোর জন্য ২৪-ঘণ্টা চিকিৎসা তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। আমাদের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং প্যারামেডিক দল বিশেষভাবে এই কাজের জন্যই সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকেন।

তিনি বলেন, মাদকাসক্তি থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি একটি মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। আমরা রোগীদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে কাজ করছি। অনেক রোগী চিকিৎসা শেষে চাকরি, ব্যবসা বা শিক্ষাজীবনে ফিরে যাচ্ছেন।

প্রশান্তি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম বলেন, সমাজে এখনও মাদকাসক্তদের নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেক পরিবার লজ্জার কারণে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে চায় না। অথচ মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ জীবনে ফিরতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে।

এম খোরশেদ আলম বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। বিদ্যালয়, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক জাতীয় গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ) মাদকাসক্ত। নতুন নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের বিস্তারে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ঢাকার তেজগাঁওয়ের নিরাময় কেন্দ্রসহ তিনটি বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। একই সাথে দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে (চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ) ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প শুরু হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সরকারি সুবিধার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে গতিশীল করতে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী লাইসেন্স প্রাপ্ত ৪০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে নির্বাচিত ৭৩টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রকে মোট ১ কোটি ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হচ্ছে।