শিরোনাম

পঞ্চগড়, ১৯ জুন ২০২৬ (বাসস): সুপারি বাগানের ফাঁকা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে সাথি ফসল হিসেবে লটকন চাষ করে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার উদ্যোক্তা আবু বাদশা সুমন।

সুপারি গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা লটকন গাছগুলো এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা লটকন। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ায় ভালো লাভের আশা করছেন উদ্যোক্তা। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই বাগান দেখতে এসে লটকন চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের আদাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আবু বাদশা সুমন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সুপারি চাষের সঙ্গে জড়িত। তার তিন বিঘা আয়তনের সুপারি বাগানে রয়েছে প্রায় ৩০০টি সুপারি গাছ। কয়েক বছর আগে বাগানের ফাঁকা জায়গা অব্যবহৃত পড়ে থাকতে দেখে সেখানে সাথি ফসল হিসেবে লটকনের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে সীমিত পরিসরে চাষ শুরু করলেও পরে ফলন ও বাজারমূল্য ভালো পাওয়ায় তিনি এ চাষ সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে সুপারির পাশাপাশি লটকন তার পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে তার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধ সুপারি গাছের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা লটকন গাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে আছে। সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে হলুদাভ রঙের পাকা লটকন। কোথাও কোথাও একটি থোকায় শতাধিক ফল ঝুলতে দেখা যায়। বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মনোরম এক প্রাকৃতিক দৃশ্য। ফল সংগ্রহের প্রস্তুতিও শুরু করেছেন উদ্যোক্তা।
এই বাগান এখন স্থানীয়দের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক এবং দর্শনার্থীরা বাগানটি দেখতে আসছেন। অনেকে মুঠোফোনে ছবি তুলছেন। স্থানীয়দের মতে, একই জমিতে দুই ধরনের লাভজনক ফসল উৎপাদনের এই উদ্যোগ কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, বাদশা সুমনের সফলতা দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে অনেক কৃষকই লটকন চাষে এগিয়ে আসবেন। এতে এলাকার কৃষিতে বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা আগে সুপারি বাগানের নিচে শুধু খালি জায়গা দেখতাম। এখন দেখছি সেই জায়গা কাজে লাগিয়ে লটকন চাষ করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। বিষয়টি আমাদের উৎসাহিত করছে। আমিও সাথি ফসল নিয়ে ভাবছি। কৃষি বিভাগ যদি সহযোগিতা করে তাহলে আরও অনেক কৃষক এই চাষে আগ্রহী হবেন।

উদ্যোক্তা আবু বাদশা সুমন জানান, সুপারি বাগানের অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনের আওতায় আনতেই তিনি লটকন চাষ শুরু করেন। গত বছর সুপারি বিক্রি করে প্রায় ৪ লাখ টাকা এবং লটকন বিক্রি করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আয় করেছেন। এ বছর গাছে আরও বেশি ফল ধরেছে। ফলে আয়ও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
বাদশা সুমন বলেন, প্রথমদিকে কয়েকটি গাছ লাগিয়ে পরীক্ষা করেছি। পরে দেখি গাছগুলো ভালো বেড়ে উঠছে এবং ফলনও সন্তোষজনক। তখন আরও গাছ লাগাই। এখন প্রতি বছরই লটকন থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, সুপারি বাগানে সাথি ফসল হিসেবে লটকন চাষে বাড়তি কোনো বড় বিনিয়োগ লাগে না। পরিচর্যার খরচও খুব কম। সুপারি গাছের জন্য যে পরিচর্যা করা হয়, তার অনেকটাই লটকন গাছের জন্য কাজে আসে। ফলে অল্প খরচে ভালো লাভ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। কৃষকরা চাইলে এ পদ্ধতিতে বাড়তি আয় করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও উন্নত জাতের চারা সহজলভ্য করা গেলে এ অঞ্চলে লটকন চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। অনেক কৃষক আগ্রহ দেখাচ্ছেন, কিন্তু কারিগরি জ্ঞানের অভাবে এগোতে পারছেন না।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পঞ্চগড় জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬৬০ হেক্টর জমিতে সুপারি এবং ৪৫ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ রয়েছে। জেলার আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ এই দুই ফসলের জন্য বেশ উপযোগী। বিশেষ করে সুপারি বাগানের আংশিক ছায়াযুক্ত পরিবেশে লটকনের গাছ ভালো বৃদ্ধি পায় এবং ফলনও ভালো হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, পঞ্চগড়ে সুপারি ও লটকন চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সাথি ফসল হিসেবে লটকন চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃষি বিভাগ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, লটকনের বাজার চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তাই পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে পঞ্চগড়ের কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবেন।