শিরোনাম

বাবুল আখতার রানা
নওগাঁ, ১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই অতিবৃষ্টিতে মৌসুমি সবজিসহ কাঁচামরিচের উৎপাদন ব্যাহত হলেও কাঁচামরিচ বিক্রিতে লাভবান নওগাঁর চাষিরা। ফলে সাধারণ ক্রেতারা বিপাকে পড়লেও স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছেন কৃষকরা।
মাত্র ৮ কাঠা জমিতে কাঁচা মরিচ চাষ করেছিলেন সদর উপজেলার ফারাদপুর গ্রামের কৃষক নিলয় প্রামাণিক। প্রথম কয়েকদিন ১০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি হওয়ায় খুব খুশি ছিলেন। কিন্তু একদিনের বৃষ্টিতে মাথায় হাত। প্রায় তিন তৃতীয়াংশ জমির গাছ তলিয়ে গিয়ে আশায় গুড়ে বালি। তবে আবারও লাভের আশায় মরিচ চাষ করেছেন তিনি।
শস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁয় খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচের দাম বাড়তে বাড়তে এখন ৩০০ টাকা হয়েছে। যা গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে প্রায় ২১০ টাকা। এতে এই জেলার কৃষক লাভবান হলেও কাঁচা মরিচের ঝাঁজে দিশেহারা সাধারণ ক্রেতারা।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নওগাঁর কাঁচা মরিচের বাজারে এসেছে বড় ধরনের অস্থিরতা। এক সপ্তাহ আগেও যে মরিচ প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা ছিল, তা পর্যায়ক্রমে ১০০-১৫০টাকায় বিক্রি হতো। সেটিই এখন পাইকারি বাজারে ২৩০ থেকে ২৫০টাকা এবং খুচরা বাজারে ২৮০ থেকে ৩০০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকস্মিক এই মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকরা যেমন ভালো দাম পেয়ে সন্তুষ্ট, তেমনি নিত্য প্রয়োজনীয় এ পণ্যের বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতিবৃষ্টিতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। আর সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে কাঁচা মরিচের আবাদ হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেশি, সাদা ও আকাশী জাতের মরিচের চাষ করা হচ্ছে। তবে চলমান বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টির কারণে প্রায় ১০ হেক্টর জমির মরিচ ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি কাঁচা মরিচের বাজার মহাদেবপুর উপজেলার মোমিনপুর হাটেও এখন একই চিত্র। এই হাটে বছরে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস মরিচের বেচাকেনা চলে। প্রতি মাসে প্রায় তিন কোটি টাকার কাঁচা মরিচ কেনাবেচা হয়। বর্তমানে প্রতিটি হাটবারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার মরিচের লেনদেন হচ্ছে। এখান থেকে নওগাঁ ছাড়াও রাজশাহী, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মরিচ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রামের বাজারেও নিয়মিত এখানকার মরিচ পাঠানো হয়।
এই হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামে বিশেষ করে সাদা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা তিনজন ব্যবসায়ী মিলে প্রতি সপ্তাহে একটি ট্রাকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার মরিচ চট্টগ্রামে পাঠাই। কিন্তু বর্তমানে হাটে সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে মরিচ কিনতে হচ্ছে। ফলে পাইকারি দামও বেড়ে গেছে।
রাণীনগর উপজেলার সনজিত সরকার ও আলিমসহ একাধিক ক্রেতা জানালেন কুজাইল বাজারে আজ কাঁচা মরিচের কেজি ২৮০টাকা। আগে যেখানে হাফ কেজি থেকে এক কেজি করে কিনতাম এখন ৭০টাকা দিয়ে এক পোয়া কিনতে হচ্ছে। তবে নওগাঁ শহরের চেয়ে এখানে একটু দাম কম।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মরিচের পাইকারি দাম ২৫০টাকা কেজি। এরপর আছে পরিবহন খরচ। তাই ২৮০টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নওগাঁ শহরের সুবল নামের এক ক্রেতা জানান, পালপাড়া খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচের কেজি ২৫০টাকা। তবে গতকালের চেয়ে আজ একটু দাম কম।
খুচরা ব্যবসায়ী রাশেদ জানান, আজ কাঁচা মরিচ ২৬০টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। গতকাল এই মরিচ বিক্রি করা হয়েছে ২৪০টাকায়।
কৃষকদের দাবি, অতিবৃষ্টিই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। নিচু এলাকার অনেক মরিচ ক্ষেত কয়েক দিন পানির নিচে থাকায় গাছ নষ্ট হয়েছে। নতুন গাছে ফলনও প্রত্যাশার তুলনায় কম এসেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে মরিচের জোগান কমেছে। আর সেই সুযোগে দামও বেড়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার কীত্তিপুর সাপ্তাহিক হাট জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা মরিচের বাজার। প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার ভোর থেকেই কৃষকরা মাঠ থেকে তোলা টাটকা মরিচ নিয়ে হাটে আসেন। সকাল ৮টার মধ্যেই অধিকাংশ মরিচ বিক্রি শেষ হয়ে যায়। কীত্তিপুর, বর্ষাইল ও বক্তারপুর ইউনিয়নের পাশাপাশি পাশের বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের শতাধিক কৃষক এই হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে এই হাটে জাতভেদে প্রতি কেজি মরিচ ২৩০থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। পরে ধাপে ধাপে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। দাম বৃদ্ধির পর প্রতিটি হাটবারে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মরিচের বেচাকেনা হচ্ছে।
সদর উপজেলার আতিতা গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে মরিচের আবাদ করেছি। নতুন গাছ থেকে দুই সপ্তাহ ধরে অল্প পরিমাণ মরিচ তুলছি। আজ ২২ কেজি মরিচ ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি।
সপ্তাহে দুই দিন মরিচ তোলা হচ্ছে। এবার দাম ভালো থাকায় কিছুটা লাভ হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহও বাড়বে, তখন দাম কমে আসবে।
ভালো দাম পেলেও কৃষকদের অনেকেই বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেতেই ফলন স্বাভাবিক থাকলে কম দামেও মোট বিক্রি বেশি হতো। ফলে বর্তমান উচ্চমূল্য ক্ষতির পুরোটা পুষিয়ে দিতে পারছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম কৃষকদের জন্য ইতিবাচক। তবে অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।