শিরোনাম

॥ বরুন কুমার দাশ ॥
ঢাকা, ১৭ জুন, ২০২৬ (বাসস) : রাজধানীর আজিমপুর কলোনির রাইয়ান আহমেদ। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে প্রতিদিন চকলেট ফ্লেভারের বিস্কুট খায়, আবার টিফিনে থাকে চিপস বা কেক আর কোমল পানীয়। বিকেলে বাবা-মা অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসেন চানাচুর, নুডলস কিংবা এই ধরনের প্যাকেটজাত খাবার।
পরিবারের সবারই পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে এসব অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার। সহজলভ্যতা, আকর্ষণীয় প্যাকেট এবং দামও নাগালের ভেতরে থাকায় এগুলো ক্রমশ ব্যস্ত জীবনের সহজ সমাধান হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সম্প্রতি পরিবারের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বাবার উচ্চ রক্তচাপ, মায়ের ডায়াবেটিস আর রাইয়ানের ওজনও স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
চিকিৎসক বলেছেন, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া কমাতে হবে। তখন পরিবারটি প্রথমবারের মতো বুঝতে শুরু করে, যে খাবারগুলোকে তারা ‘সাধারণ স্ন্যাকস’ মনে করেছিল, কিন্তু সেগুলোই ধীরে ধীরে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
এ বিষয়ে রাইয়ানের মা জুলেখা পারভীন বাসস’কে বলেন, ‘দোকান থেকে প্যাকেটে মোড়ানো খাবার স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ ভেবেই কিনি। কেনার সময় শুধু ডেট ছাড়া আর কিছুই লক্ষ্য করা হয় না, কারণ প্যাকেটের পিছনে ছোট ছোট অক্ষরে কিছু তথ্য লেখা থাকে, যা পড়ে বোঝা প্রায় অসম্ভব। কখনও জানতেই পারিনি কোন খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, কিংবা ক্ষতিকর ফ্যাট রয়েছে!’
বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের গল্প বর্তমানে অনেকটা এমনই। নিরাপদ ভেবে প্রতিদিন তারা উচ্চমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটের যেসব খাবার ও পানীয় গ্রহণ করছে তা তাদের ক্রমশ ঠেলে দিচ্ছে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের দিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫ লাখ ৭০ হাজার ২৬৩ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ এবং এর ১৯ শতাংশই অকালমৃত্যু।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এসব রোগের বড় অংশই জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, মানুষ কী খাচ্ছে, কতটা লবণ, চিনি বা সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করছে, এসব এখন শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বড় প্রশ্ন।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। শহর তো বটেই, এখন গ্রামেও প্যাকেটজাত ও উচ্চমাত্রার প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার দ্রুত বেড়েছে। এসব খাবারের একটি বড় অংশে অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাট থাকে।
গবেষণায় জানা গেছে, সাধারণভাবে প্যাকেটজাত খাবারকে নিরাপদ বা স্বাস্থ্যকর মনে করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৫ সালে ৯৭৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার শনাক্ত করতে দেশব্যাপী একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে ১৪টি খাদ্য ক্যাটাগরির আওতায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের ৬৩ শতাংশে উচ্চমাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আবার অনেক পণ্যের প্যাকেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, চিনি ও লবণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং) বা এফওপিএলকে একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে সুপারিশ করেছে। এরইমধ্যে বিশ্বের ৪৪টি দেশ এফওপিএল ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মধ্যে ১০টিতে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল বাধ্যতামূলক।
এফওপিএল বাস্তবায়নের ফলে এসব দেশে ভোক্তা সচেতনতা বেড়েছে এবং উৎপাদকরাও পণ্যের মান উন্নত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এফওপিএল অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্যাকেটজাত খাদ্যের সম্মুখভাগে সহজবোধ্য সতর্কতামূলক লেবেল-এফওপিএল চালু করা হলে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলায় সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ এর খসড়ায় বাধ্যতামূলক এফওপিএল অন্তর্ভুক্ত করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাদ্যের প্যাকেটের সামনে কালো অষ্টভুজাকারে সতর্কবার্তা দিতে হবে। এটি বাধ্যতামূলকভাবে চালু হলে ভোক্তা সতেচনভাবে স্বাস্থ্যসম্মত খবার নির্বাচন করতে পারবে, ফলে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বাসস'কে বলেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার সম্পর্কে ভোক্তা সচেতনতা তৈরি করতে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা প্রচলনের কাজ চলমান রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে, দেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালু করা খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) ঝুঁকি মোকাবিলায় ডবি¬উএইচও সুপারিশকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ, যা জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে ভূমিকা রাখবে।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বাসস'কে বলেন, ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং কেবল একটি লেবেলিং পদ্ধতি নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত চিনি, লবণ (সোডিয়াম), স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স-ফ্যাটসমৃদ্ধ অতি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্থূলতাসহ অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, এফওপিএল অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ার। প্যাকেটের সামনের স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তা স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি উভয়ের জন্যই টেকসই উন্নয়ন বয়ে আনবে।